Calcutta Television Network

ইতিহাস, ভক্তি এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনকে সঙ্গে নিয়ে কালনার বুকে আজও নীরবে বয়ে চলেছে এই পাতালগঙ্গা!

ইতিহাস, ভক্তি এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনকে সঙ্গে নিয়ে কালনার বুকে আজও নীরবে বয়ে চলেছে এই পাতালগঙ্গা!
16 September 2026 03:20:09 pm

পূর্ব বর্ধমান জেলার ভাগীরথী নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থান কালনা, যাকে বলা হয় মন্দিরনগরী। অম্বিকা দেবীর মন্দির আছে তাই এ জায়গার নাম হয়েছে অম্বিকা কালনা। এছাড়াও ১০৮ শিবমন্দির থেকে শুরু করে রাজবাড়ির মন্দির সহ বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য এই শহরকে হেরিটেজের তকমা দিয়েছে। আর এই কালনাতেই রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আশীর্বাদধন্য সাধক ভগবান দাস বাবাজির আশ্রম, যাকে সবাই  'ব্রহ্মবাড়ি' নামেই জানে। কালনার ফটকদ্বার এলাকায় অবস্থিত এই আশ্রমটির প্রধান আকর্ষণ 'পাতালগঙ্গা'। আধ্যাত্মিক এই স্থানটিতে আজও রয়ে গেছে রহস্য যার কিনারা করতে পারেনি বিজ্ঞানও।

      

এই 'পাতালগঙ্গা'-র ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে ঊনবিংশ শতকের এক পরম বৈষ্ণব সাধক ভগবান দাস বাবাজির সঙ্গে। তিনি ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের চরণাশ্রিত এক সিদ্ধপুরুষ। ১৮২৫ সাল নাগাদ তিনি কালনায় এসে তাঁর 'ব্রহ্মবাড়ি' আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, সাধক ভগবান দাস বাবাজির প্রাত্যহিক নিয়ম ছিল ভাগীরথী নদীতে গিয়ে গঙ্গাস্নান তারপর ইষ্টদেবতা রাধা-গোবিন্দর উপাসনা। কিন্তু বার্ধক্য যখন তাঁকে গ্রাস করল, বয়সের ভারে শরীর যখন ন্যুব্জ হয়ে পড়ল, তখন প্রতিদিন পায়ে হেঁটে নদীতে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। গঙ্গাস্নানে ব্যাঘাত ঘটায় ব্যথিত হৃদয়ে তিনি তাঁর আরাধ্য দেবতার কাছে মনের কষ্ট জানান। এরপরই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা। একদিন সকালে তিনি দেখেন, আশ্রম প্রাঙ্গণের মাটি ভেদ করে জলধারা উঠছে। বিস্ময়ের বিষয় ছিল, সেই জলের রঙ সাধারণ কুয়োর জলের মত স্বচ্ছ নয়, বরং ভাগীরথীর নদীর জলের মতই ঘোলাটে। শুধু তাই নয়, নদীর জলের মত সেই জলেও ভেসে আসছিল কচুরিপানা! ভক্তরা বিশ্বাস করেন, ভক্তের আকুল ডাকে সাড়া দিয়ে স্বয়ং গঙ্গা দেবী পাতাল পথে এই সিদ্ধসাধকের আশ্রমে আবির্ভূতা হন। 

পরবর্তীকালে স্থানীয় রাজাদের উদ্যোগে সেই স্থানটি খনন করে একটি কুয়ো তৈরি করা হয়, যা আজ 'পাতালগঙ্গা' নামে খ্যাত। বর্তমানে ভাগীরথী নদী কালনার এই ব্রহ্মবাড়ি আশ্রম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে সরে গিয়েছে। কিন্তু পাতালগঙ্গার কুয়োর সঙ্গে নদীর সংযোগ আজও অবিচ্ছিন্ন। নদীতে যখন জোয়ার আসে, তখন নদী থেকে অনেক দূরে থাকা এই কুয়োর জলও আশ্চর্যজনকভাবে বেড়ে যায় আবার ভাটায় নদীর জল কমলে কুয়োর জলও কমে যায়। ভাগীরথীর জল ঘোলা হলে কুয়োর জলও ঘোলাটে রূপ নেয় এবং নদীতে ভেসে থাকা কচুরিপানা রহস্যময়ভাবে এই কুয়োর বদ্ধ জলে এসে জমা হয়। 


ভূগর্ভস্থ কোনো প্রাকৃতিক সংযোগ বা জলবাহী স্তরের কারণে এটি ঘটে থাকলেও, এর সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক রহস্য আজও বিজ্ঞানের কাছে  অমীমাংসিত। বর্তমানে কালনার এই ব্রহ্মবাড়ি শুধু ভক্তদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, বরং কৌতূহলী পর্যটকদের জন্যও এক অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। শান্ত ও স্নিগ্ধ এই আশ্রমে রয়েছে সাধক ভগবান দাস বাবাজির সমাধি মন্দির। প্রতিদিন বহু মানুষ এই পাতালগঙ্গার কুয়ো দর্শন করতে এবং এর পবিত্র জল মাথায় ঠেকাতে ভিড় করেন। ইতিহাস, ভক্তি এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনকে সঙ্গে নিয়ে কালনার বুকে আজও নীরবে বয়ে চলেছে এই পাতালগঙ্গা!

×
  • CTVN