Calcutta Television Network

প্যান-ডি, ইসবগুল আর আলুভাতে, মধ্য'বিত্ত' বাঙালি!

প্যান-ডি, ইসবগুল আর আলুভাতে, মধ্য'বিত্ত' বাঙালি!
19 September 2026 01:57:15 pm

“দাদা, একটু চেপে বসুন, অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে।”-ছয় জনের সিটে সাত নম্বর ঢুকে পড়া মানুষটাই মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত বললে এমনিতেই মনে হয় একটা মাঝামাঝি ব্যাপার। না এদিক না ওদিক, মাঝা-মাঝি থেকে যাওয়া এক শ্রেণী। যাদের না বড়লোকের মত আত্মবিশ্বাস আছে, না গরিবের হতাশা। শ্রেণী চরিত্র কিছুটা বদলালেও মধ্যবিত্তের স্বভাব কিন্তু আজও বদলায়নি। বিত্ত কিছুটা বদলালেও 'মধ্য'টা রয়ে গেছে একই। এরা রেশনের  লাইনে দাঁড়াতেও লজ্জা পায়, আবার পাঁচতারা হোটেলে গিয়ে জলের বোতলের দাম দেখে বিষম খায়। এরা বড়লোককেও ঘৃণা করে আবার গরিবকেও। দিন শেষে ওই ঢেঁকুর তুলে ভয়ঙ্কর এক দীর্ঘশ্বাস তোলে, "ইস! যদি বড়লোক হতাম।"


ফ্ল্যাটের বারান্দা, চারটে মানিপ্ল্যান্টের টব আর আগের দিনের কাচা জামাকাপড় ঝোলানো বারান্দায় দিন শুরু হয় মধ্যবিত্তের। পাশের বাড়ির চুমকি টু ডোনাল্ড ট্রাম্প, সবার সবার খবর নিয়ে, আমলকি আর প্যান-ডি পরে অন্তত বাথরুমে কাটে ঘন্টা খানেক। চা-জলখাবার তারপরে ভিড় ঠেলে অফিস, ট্রেনে-বাসে মারামারি, খিস্তি-গালাগালি, চা-সিগারেট, রাজনীতি-বিপ্লব-আড্ডা-ক্যারাম আবার পুরো বিষয়টা রিপিট, বেশ সিনেমার মত জীবন। এই মধ্যবিত্ত হোটেলে খেতে গেলে, ফিজিক্স বইয়ের মত গোটা মেনু কার্ডটা পড়ে ফেলে, কিন্তু অর্ডার দেয় সেই বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ, একটাই ভয়, 'যদি পয়সা বেশি খরচ হয়ে যায়।'

মধ্যবিত্তের অ্যাডজাস্টমেন্টের খেলা কিন্তু চলে রান্নাঘরেও। রবিবারের খাসির মাংসের ঝোলে, মাংসের চেয়ে আলুর সংখ্যা বেশি থাকে। কারণ, বাঙালি বিশ্বাস করে, মাংসের সব পুষ্টি  আলুটাই শুষে নেয়, বা ধরুন গরম ভাতে একটুকরো খাসি আর দুটো আলু-ব্যস শান্তি! তারপরেই গ্যাস, অম্বল আর চোঁয়া ঢেকুর। ইঁচড়কে গাছপাঁঠা, সয়াবিনের পুষ্টি গুন বা গরম ভাতে ঘি আর ডিম সেদ্ধ, অ্যাডজাস্টমেন্টটা খেয়াল করুন। মুশকিল হল এরা না পারে বড়লোকের মত প্রতিদিন ব্রাউন রাইস উইথ চিকেন ভুনা খেতে আবার না পারে গরিবের মত পান্তাভাতে চিকেনের নাড়িভুড়ি খেতে। কি বিড়ম্বনা মাইরি!

মধ্যবিত্ত শপিং মলে গিয়ে জামাকাপড়ের ডিজাইন পরে দেখে, আগে হাতড়ায় ‘প্রাইস ট্যাগ’। তারপর মনে মনে হিসাব কষে, “দূর, হাতিবাগান বা গড়িয়াহাটে এর চেয়ে ভালো জিনিস অর্ধেক দামে পাওয়া যাবে।” তবে ব্র্যান্ডের প্রতি মোহ যে নেই তা নয়। তবে বাঙালি মধ্যবিত্তের ইমোশন সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে তাদের ঘরের আলমারি খুললে। সেখানে পুরোনো হরলিক্সের বৈয়ামে রাখা থাকে বোতাম, সুতো, খুঁজলে হয়ত গুপ্ত যুগের জিনিসও পাওয়া গেলে যেতে পারে। কোনো প্লাস্টিক বা  দোকানের শক্তপোক্ত শপিং ব্যাগ, কোনোদিন ফেলা যায় না। টাকা-পয়সা নয়, ওগুলোই যেন ভবিষ্যতের সঞ্চয়। এমনকি টুথপেস্ট শেষ হয়ে গেলেও সেটাকে টিপেটুপে বা কাঁচি দিয়ে কেটে শেষ ফোঁটা পর্যন্ত ব্যবহার না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় বোধহয়। 

মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে ট্রাভেল মানেই হলো 'দিপুদা', দিঘা, পুরী অথবা দার্জিলিং। যদিও হালফিলের মধ্যবিত্ত চাইলেই ইতালি ঘুরে আসতে পারে কিন্তু এই তিনটে জায়গার সাথে এদের নাড়ির টান বহুদিনের। অন্তত এক মাস আগে থেকে ট্রেনের টিকিট কনফার্ম হলো কি না, তা নিয়ে বাড়ির কর্তার রক্তচাপ ওঠানামা করে। ট্রেনে উঠেই বের হবে বাড়ি থেকে ভেজে আনা লুচি আর আলুর দম, আরও হরেক আইটেম। ট্রেনের বোতলজাত জল কেনার বদলে, স্টেশনের কল থেকে বোতলে জল ভরে নেয়াটাকেই বেশি সাশ্রয়ী মনে করে। হোটেলে ঢোকার আগে হিসেবে কষে নেওয়া বা হোটেলের ফ্রি সাবান-শ্যাম্পু গুলো ফের 'ভবিষ্যতের সঞ্চয়' করে নেওয়া, আহারে! মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবন।   


বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবন এখন অবশ্য একটু আধুনিক হয়েছে। ড্রয়িংরুমে ঢুকেছে ওটিটি । কিন্তু স্বভাব কি বদলায়? বিপ্লব, রাজনীতি আর রবীন্দ্রনাথ এখনও আড্ডা জমায় মধ্যবিত্তের। সেই মাসের শেষে হিসেবে কষা, আর একটুকরো পাঁঠা আর খাসির ঝোলে থাকা বাঙালি মধ্যবিত্তর   সমস্ত কিপটেমি আর হিসাব-নিকাশের বাইরে একটা সুন্দর জীবন আছে। আজও পাড়ার কারও অসুখ হলে এরা সবার আগে রক্তের বোতল জোগাড় করতে দৌড়ায়। পুজোয় নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ এদের চেয়ে বেশি কেউ উপভোগ করতে পারে না। হাজারো ইএমআই (EMI), টিউশন ফি আর বাজার ফর্দর চাপ মাথায় নিয়েও, সন্ধেবেলা একটু চপ-মুড়ি খেয়ে দিব্যি বলতে পারে, "আহা, জীবনটা কিন্তু মন্দ নয়!"

ছবি: এআই 

×
  • CTVN