Calcutta Television Network

প্রথম ভোটের গপ্পো

প্রথম ভোটের গপ্পো
18 September 2026 02:51:52 pm

ভোট মানেই মিছিল, মাইক, প্রচার, নিরাপত্তা আর কখনও কখনও অশান্তির খবর, শেষ ভোটটি ব্যতিক্রম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতির শুরুর দিনগুলির ছবি ছিল খানিক আলাদা। ১৯৫২ সাল। স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। কলকাতার ভোটকেন্দ্রগুলিতে ছিল শান্ত পরিবেশ। প্রার্থীরা ছিলেন হেভিওয়েট, রাজনৈতিক লড়াইও ছিল তীব্রতর, কিন্তু ভোটকে ঘিরে হিংসার ছবি তখনও সেভাবে প্রত্যক্ষ করেনি বাংলা। ১৯৫২ সাল, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ। কলকাতায় তখন শৈত্য প্রবাহ। বউবাজারের ওয়েলিংটন স্ট্রিটের কর্পোরেশন মডেল স্কুলে ভোট দিতে আবির্ভূত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। তিনি নিজেই ওই কেন্দ্রের প্রার্থী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী ভোট দিয়ে বেরোলেন, গাড়িতে উঠলেন, বিদায় নিলেন ভোটকেন্দ্র থেকে। সেদিন না ছিল আজকের মত ক্যামেরার ভিড়, না ছিল সরাসরি সম্প্রচারের হিড়িক।

ভোটাররা নিজের মতো করে বুথে ঢুকেছেন, ভোট দিয়েছেন, সানন্দে বাড়ি ফিরেছেন। সেই নির্বাচনে বিধানসভা এবং লোকসভা—দুই ভোটই হয়েছিল একত্রে। দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্রে লড়েছিলেন জনসংঘের সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তাঁর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন কংগ্রেসের মৃগাঙ্কমোহন সর। উত্তর-পশ্চিম কলকাতা কেন্দ্রে বামপন্থী প্রার্থী হয়েছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ও লাভ করেন। কলকাতার কিছু এলাকায় ভোটারদের উৎসাহ ছিল বিপুল। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য কলকাতায় সকাল থেকেই বহু মানুষ বেরিয়েছিলেন ভোট দিতে। দক্ষিণ কলকাতায় আবার অনেক মহিলা ভোটার বিকেলের দিকে বুথমুখী হন। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিবেশ ছিল আরও বেশ কিছুটা শান্ত। ভোটারদের একটি বিপুল অংশ তখনও ভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ভোটের দিন অধিকাংশ সরকারি দফতরে ছুটি ছিল। বহু বেসরকারি অফিসেও কাজ চলেছিল অল্প সময়ের জন্য। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট নেওয়ার পর ছিল একটা এক ঘণ্টার বিরতি। দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ফের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া চলে। কলকাতার প্রায় চার হাজার কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হয় সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে। সংবাদপত্রের রিপোর্টেও উঠে এসেছিল স্বাধীন দেশে সেই শান্তিপূর্ণ ভোটযাপনের কথা। আজকের রাজনৈতিক অভিধানে থাকা ‘বুথ ক্যাপচারিং’ বা ‘রিগিং’-এর মতো শব্দ তখন ভোটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়নি। প্রথম নির্বাচনের সময় পুলিশ বুথ পাহারা দিয়েছিল এটাও সত্যি, কিন্তু বড় ধরনের সংঘর্ষের কোনো খবর ছিল না। বেলগাছিয়ায় এক বার পটকা ফাটার ঘটনা ঘটে। তাতে অবশ্য কেউ আহত হননি। শুধুই খরচ কয়েক শব্দ নিউজপ্রিন্ট। এই সুবিশাল নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। গণিত ও প্রশাসনের অভিজ্ঞতা থাকা এই স্বনামধন্য বাঙালি আমলার সামনে কাজটি ছিল বেশ কঠিন। সদ্য স্বাধীন দেশে ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে গোটা ভোটপ্রক্রিয়া পরিচালনা, সবই ছিল প্রায় নব্য অভিজ্ঞতা। লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রথম বার ভোটের ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করানোটাও ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। ষাটের দশকে কলকাতার রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়। নির্বাচনী প্রচারে মাইকের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। আর ১৯৯০-এর কলকাতা পুরভোটে সেই উত্তাপ ভিন্ন মাত্রা নেয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বোমাবাজি, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাপাদাপি এবং সংঘর্ষের খবর সম্মুখে আসতে থাকে। সাংবাদিকেরা বাইরে অশান্তির শব্দ শুনলেও রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে বহু সময় শুনতে হয়েছিল, ভোট নাকি ‘শান্তিপূর্ণ’ হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও নব্বইয়ের দশক ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের সময় ভোটের নিয়ম আরও কড়া করার উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন ছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সে বারও লোকসভা ও বিধানসভা ভোট হয়েছিল একযোগে। অধিকাংশ জায়গায় ব্যালট পেপার ব্যবহার হলেও কয়েকটি কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক ভাবে ইভিএম মেশিন চালু করা হয়। ব্যালট নিয়ে কারচুপি বা ফলাফলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা কমাতে সেশনের আমলে গণনার পদ্ধতিতেও ধীরে ধীরে বদল আনা হয়েছিল। বিভিন্ন বাক্সের ব্যালট একত্র করে মিশিয়ে দেওয়ার পর গণনা শুরু হত। ফলে নির্দিষ্ট বুথে কোন প্রার্থী কত ভোট পেলেন, তা আলাদা করে বোঝা তখন কঠিন হয়ে যেত। এর ফলে গণনায় সময়ও লাগত অনেক অধিক। আজকের মতো মোবাইল ফোন, অনলাইন ফলাফল কিংবা মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা তখন অমিল। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে তৈরি হত ফলাফল সংগ্রহের বিশেষ কন্ট্রোল রুম। প্রতিটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকেরা হটলাইনের মাধ্যমে সেখানে যোগাযোগ রাখতেন। অনেকে আবার রেডিওর সামনে বসেও অপেক্ষা করতেন ফলাফলের।

এক সময় যে ভোটকেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী এসে নিঃশব্দে ভোট দিয়ে চলে যেতেন, কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই ভোটই হয়ে উঠল রাজনৈতিক সংঘর্ষ, রিগিং এবং নির্বাচনী সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলার ভোটের এই দীর্ঘ পথ আসলে শুধু একটি নির্বাচন ব্যবস্থার বদলের আখ্যান নয়, জড়িয়ে আছে বদলে যাওয়া রাজনীতি, সমাজ এবং মানুষের রাজনৈতিক অভ্যাসেরও এক অদ্ভুত কালখন্ড।

×
  • CTVN