ড. কল্যাণ চক্রবর্তী: আকন্দ ফুলের আলংকারিক রূপে বিমোহিত হয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক শিল্পী সুধীরঞ্জন মজুমদারকে তা আলপনায় রূপান্তরিত করতে দেখেছি। একটি প্রচল কথা হল, "আকন্দে যদি মধু পাই, তবে কেন পর্বতে যাই!" মধুকর এই কথা বলছে তারই সহকর্মী মধুকরকে। এ বাঘা মৌমাছি বা Rock Bee-র আত্মকথা। মৌমাছি রোজই এই আলপনা অবলোকন করে আকন্দ ফুলে।
আকন্দ ফুলের কেন্দ্রের চূড়ার দিকে তাকাই। পাশাপাশি কয়েকটি উল্টোনো কলকা। ফুলটিকে ওপর থেকে দেখলে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই। পাঁচটি পাপড়ির প্রস্ফুটিত পরিবেশনে যেন গতির চক্রাকার ঘূর্ণন। আকন্দ ফুলের মধ্যে element of design ধরা দিয়েছে পুরো মাত্রায়। যেন পুষ্পগুচ্ছ সমবেত আলপনা হয়ে ফুটে উঠেছে।
অর্ক বা আকন্দ ফুলে থাকে পাঁচটি সূঁচালো পাপড়ি, ফুলের মাঝখান থেকে উঠে আসে একটি ছোট মুকুটের মতো অংশ, যা পুংকেশরগুলিকে ধরে রাখে। পুংকেশরগুলি ঝিল্লিযুক্ত উপাঙ্গ নিয়ে ছোট পঞ্চভুজাকার স্টিগমা বা গর্ভমুণ্ডের অবনমিত শীর্ষের উপর বাঁকানো। আকন্দ ফুলের অ্যাস্টিভেশন হল ভালভেট অর্থাৎ পাপড়ি একটি ঘূর্ণায়মান অংশে থাকে, কেবল প্রান্তে একে অপরকে করে স্পর্শ। আকন্দে গাইনোস্টেজিয়ামের উপস্থিতি, অর্থাৎ স্টিগমা এবং অ্যান্ড্রোসিয়ামের অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী অংশের সংমিশ্রণ। এটাই কী শিবশক্তির মিলন! আকন্দ ফুল এনটোমোফিলি পরাগায়নের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ এই ফুল কীট দ্বারা পরাগায়ন হয়, যেমন মৌমাছির দ্বারা। ফুলের পরাগরেণুগুলি পলিনিয়া নামক একটি কাঠামোতে থাকে যা গর্ভমুণ্ডে গ্রন্থিযুক্ত, আঠালো ডিস্কের সাথে সংযুক্ত থাকে। ডিস্কগুলি ফুলে ভ্রমণরত মৌমাছির পায়ের সাথে সংযুক্ত হয় এবং পতঙ্গ সরে গেলে পলিনিয়া টেনে বের করে আনে। এই পতঙ্গ আবার অন্য ফুলে ভ্রমণ করলে সেই ফুলটি পলিনিয়াম দ্বারা পরাগায়িত হতে পারে।
আলপনায় ব্যবহৃত সমস্ত প্রতীকচিহ্নগুলি পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্যোতক। মোটিফ প্রকাশের চিত্র, তাকেই চিহ্ন-সংকেত বা প্রতীক বলা যেতে পারে। আলপনায় কয়েকটি বিশেষ অঙ্কনরীতি যেমন পদ্ম, ধান, সাপ, প্যাঁচা সহ নানান পাখি, লতামণ্ডন, কলা, গুয়া, সুপারি, কড়ি, মাছ, ময়ূর, ভ্রমর, প্রজাপতি, হাঁস, মৌচাক নৌকো, সূর্য, চন্দ্র, তারা, গোলাঘর, গরু-বাছুর ইত্যাদি। কোনোটি ফসল, কোনোটি বাংলার চিরায়ত জৈববৈচিত্র্য। আলপনার মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সরলতার একককে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছে সৌন্দর্য-প্রিয় মানুষ। আলপনাই সম্ভবত সবচাইতে প্রাচীন চিত্রকলার এক বিবর্তিত রূপ, যেখানে অঙ্কনের মূল কাঠামোটি আবিষ্কারের চেষ্টা আছে। আলপনার তন্বিষ্ঠ পাঠ করলে দেখা যাবে সেখানে পরিবেশিত চিহ্ন-সংকেতে পরিবেশ-ভাবনা। সূর্য-চন্দ্র-তারা-নদী-সমুদ্র-পর্বত-বনানী এবং জৈববৈচিত্র্যের সমাহারে যে সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপিত হয়। এ সকলই লোকশিল্পীর চেনা-পরিচিত জগতের চিত্ররূপ। মানুষ যা দেখে তাই ভাবে, তাই আঁকা হয়ে ধরা দেয়। আকন্দের আলপনা এঁকে লোকমানস ধরা দিলেন শিল্পী সুধীররঞ্জনও। বুনোফুলের এ এক অরূপ সৌন্দর্য, তা যেন শিবরাত্রির দিনে আমরা ভুলে না যাই। সামান্য আয়োজনে ভগবান শিব সন্তুষ্ট, এটাই সবচেয়ে বড় অসামান্যতা।
Dr. Muktisadhan Basu-র সংযোজন:
আকন্দকে উদ্ভিদ জগতের —‘নীলকণ্ঠ মহাদেব’ বলা যেতে পারে। কারণ আকন্দ গাছ মাটি থেকে পারদ, আর্সেনিক, সীসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো মারাত্মক ভারী ধাতু শোষণ করে নিতে পারে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ফাইটোরেমিডিয়েশন (Phytoremediation) বা ফাইটোএক্সট্রাকশন (Phytoextraction)।
আকন্দ একটি অত্যন্ত সহনশীল এবং শক্ত প্রকৃতির বন্য গাছ। এটি যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশ, খরা এবং দূষিত মাটিতেও সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
এর শিকড় মাটি থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু শোষণ করে নিজের কাণ্ড ও পাতায় জমা করে রাখে। এর ফলে মাটি দূষণমুক্ত হয়। যেহেতু এটি কোনো খাদ্যশস্য নয়, তাই এই বিষাক্ত ধাতু মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে (Food Chain) প্রবেশ করার কোনো ঝুঁকি থাকে না। দূষিত শিল্পাঞ্চল বা খনি এলাকার মাটি শোধন করতে আকন্দ গাছকে একটি আদর্শ প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আকন্দ ফুলের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি, ফুলের মধ্যে বীজের বৈচিত্র্যও অপরিসীম। এই বীজগুলোর গায়ে রেশমি, চকচকে সাদা তুলো বা ফাইবার যুক্ত থাকে। একে আকন্দ সীড ফাইবার বা মিল্কউইড ফাইবার (Milkweed Fiber) বলা হয়।
এই ন্যাচারাল ফাইবারে রয়েছে উষ্ণতা ধরে রাখার ক্ষমতা।
এই ফাইবার গরম পোশাক তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর। আকন্দ ফাইবার ভেতরে ফাঁপা হয়, যার কারণে এটি প্রচুর পরিমাণে বাতাস ধরে রাখতে পারে। বাতাস তাপের কুপরিবাহী হওয়ায় এই ফাইবার চমৎকার তাপ নিরোধক হিসেবে কাজ করে।
বর্তমানে জ্যাকেট, কোট এবং শীতকালীন কাপড়ের লাইনিং বা ফিলিং হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি হাঁসের পালকের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ও ভেগান বিকল্প হিসেবে জ্যাকেটে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এটি ওজনে অত্যন্ত হালকা এবং জল-প্রতিরোধক।
ড. মুক্তিসাধন বসু নিজে যেহেতু ন্যাচারাল ফাইবার (Bast fibre এবং Seed Fiber) নিয়ে কাজ করছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি কথাগুলি বলছেন।
পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে বিষমুক্ত বা আর্সেনিক ও ভারী ধাতু মুক্ত করার জন্য এবং একই সাথে বাণিজ্যিক বীজ ফাইবার বা তুলা (Seed Fiber) উৎপাদনের উদ্দেশ্যে আকন্দ গাছ মূলত নদী তীরবর্তী প্লাবনভূমি, শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন পতিত জমি এবং রাজ্যের খরাপ্রবণ ও আর্সেনিক-প্রবণ জেলাগুলোতে সফলভাবে চাষ করা যেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে এই চাষ বেশি কার্যকর হতে পারে:
১) আর্সেনিক ও ভারী ধাতু দূষিত অঞ্চল (মাটি বিষমুক্তকরণের জন্য): পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং হুগলি জেলার বেশ কিছু অংশে মাটির নিচে ও ওপরের স্তরে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি। আকন্দ গাছ মাটি থেকে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম এবং অন্যান্য ভারী ধাতু শোষণ করে তা নিজের কাণ্ড ও পাতায় জমা রাখতে পারে যার ফলে মাটি বিষমুক্ত হয়।
২) পশ্চিমের ল্যাটেরাইট ও খরাপ্রবণ অনুর্বর অঞ্চল: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ অনাবাদী ল্যাটেরাইট বা কাঁকরযুক্ত মাটিতে যেখানে সাধারণ ফসল ফলে না, সেখানে আকন্দ খুব সহজে জন্মায়। এই অঞ্চলে বীজ ফাইবারের (যা জ্যাকেটের ইন্সুলেশন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়) জন্য এর বড় আকারের চাষ লাভজনক হতে পারে।
৩) শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যভূমি (Industrial Wastelands): দুর্গাপুর, আসানসোল এবং হলদিয়াশিল্পাঞ্চলের কারখানার কাছাকাছি রাসায়নিক ও ভারী ধাতু দূষিত মাটিতে পরিবেশের ভারসাম্য ফেরাতে এবং বাণিজ্যিক ফাইবার উৎপাদনে এটি চাষ করা যায়।
৪) নদীর পাড় এবং রেললাইনের ধারের পরিত্যক্ত জমি: রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই গঙ্গা বা অন্যান্য নদীর অববাহিকায় এবং রেললাইনের ধারের বালুময় ও শুষ্ক পতিত জমিতে আকন্দ প্রাকৃতিকভাবেই ভালো বাড়ে।