শরৎ শেষে বাতাসে হেমন্তের বার্তা। উমা ঘরে ফিরেছেন, গতকাল লক্ষ্মীবন্দনা দিয়ে আপাতত কিছু দিনের রেহাই বাঙালির। গোটা ভারতে লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা হয় দীপাবলিতে, কিন্তু বাঙালিরা সেই পর্ব মোটামুটি আগেভাগেই সেরে রাখে। যদিও কোজাগরী ওপার বাংলার ঐতিহ্য, কিন্তু এখন হাল আমলে ধনদেবীর আরাধনা ঘটি-বাঙালে মিশে গেছে। মাসের মাঝামাঝিতে দুর্গাপূজা, মাসের শেষে লক্ষ্মীপূজা সব কিছু মিলে বাঙালির পকেট আপাতত টাইট। সামনে আবার কালীপূজা, ভাইফোঁটা, চাকুরীজীবী মধ্যবিত্তের কপালে ভাঁজ এখন থেকেই। 'কে জাগেরে' ডাক তুলে মা লক্ষ্মী পেঁচার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ালেন বাংলার ঘরে ঘরে, কিন্তু বাঙালি কি পারলো লক্ষ্মীদেবীকে আটকে রাখতে?
একটা সময় বাণিজ্য ও সংষ্কৃতির প্রধান কেন্দ্র ছিল আমাদের বঙ্গ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে 'কেরানি বাঙালি' তকমাটা জুড়ে গেছে কখন, তা আর বোঝা যায়নি। 'ব্যবসায় রিস্ক বেশি'- এই ভয়ের চোটেই শিল্প উদ্যোগ বাঙালির হাতছাড়া হয়েছে অনেকটাই। 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে' - এই বাক্য বাঙালি মজ্জায় এমনভাবে গেঁথে গেছে, ঝুঁকিহীন ১০-৫টার জীবন থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা। গুজরাটি, মাড়োয়ারি বা সিন্ধি জমিয়ে ব্যবসা করছে বাংলায়, আর এই ব্যবসার গদি বহুদিন আগেই হাতবদল হয়ে গেছে। একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে চারটে, ব্যবসার পরিসর কীভাবে বাড়িয়ে নিতে হয় এদের থেকে অন্তত এইটুকু শিখে নেওয়া উচিত। পুরোনো কলকাতার ইতিহাস ঘাটলে বাঙালি ব্যবসার অনেক কিংবদন্তি বেরিয়ে আসবে ঠিকই, তবে আপাতত সেসব বইয়ের পাতাতেই। বাঙালি এখন রানাঘাট লোকালে ধাক্কা খেতে খেতে অফিস যায়।
চাকরি করা ঠিক নয়! এটা কিন্তু একেবারেই বলা হচ্ছে না। কিন্তু ওই 'কাঁচা টাকা'-র কথা উঠলে এখনো ব্যবসার কথাই প্রথম উঠে আসে। চাকরি করে সুখে থাকা যায় হয়তো কিন্তু কোটিপতি বোধহয় হওয়া যায় না। তবে হ্যাঁ, এই শতকে এসে ফের বাণিজ্যমুখী বাংলার নতুন প্রজন্ম। চাকুরীজীবি হলেও ব্যবসার প্রতি আলাদা ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। এই প্রজন্ম 'স্টার্ট-আপ'-এর হাত ধরে শুরু করছে নতুন উদ্যোগ। হস্তশিল্প, বুটিক, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে আরও অনেক ছোট ছোট ব্যবসা নতুন করে পথ দেখাচ্ছে বাংলাকে। মজার ব্যাপার শুধু অর্থনীতিতেই নয়, বাঙালি শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, বিজ্ঞান গবেষণায়, সিনেমায়, খেলাধুলায় যে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে, তাও কি লক্ষ্মীলাভ নয়?
এবার প্রশ্ন যদি হয় বাঙালির আদৌ লক্ষ্মীলাভ হয়েছে কি না, উত্তরটা হ্যাঁ বা না তে দেওয়াটা একেবারেই সম্ভব নয়। একটা সময় তখন সংষ্কৃতি আর আয়ের ঊর্ধ্বে থাকা একটা জাতির অবক্ষয় তো হয়েছিল অবশ্যই কিন্তু সেটা সামলে নতুন পথ চলার দিকে চলেছে তারা। হ্যাঁ, পুরোনো মানসিকতা ছেড়ে ভাবনাচিন্তার পরিসর আরও বৃদ্ধি করলে ফের বাংলার লক্ষ্মীলাভ হবেই, সে বলার অবকাশ রাখে না। ততদিন মধ্যবিত্ত বাঙালি পেয়ারা আর আপেলের কেজি নিয়ে বচসা চালাতে থাক।