"শিব ঠাকুরের আপন দেশে, আইন কানুন সর্বনেশে", বেনারস শিব ঠাকুরের আপন দেশ। মহাকালের ত্রিশূলের ডগায় যে শহর দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছর ধরে। ভারতবর্ষের প্রাচীন জনপদের একটি, কাশী-বারানসী বা বেনারস, গোটা শহরটা একটি অনুভূতি, উপলব্ধি। বলা হয়, এই পুণ্যভূমিতে মা অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে একটা সামান্য পোকাও ক্ষুধার্ত ঘুমায় না। আর যুগ যুগ ধরেই এই কথাকেই যাপন করে আসছে কাশীক্ষেত্র। কথায় আছে, অন্নদান মহৎ দান। আর 'খিচুড়ি বাবা' এখনো হাজার ভক্তকে প্রতিদিন পেট ভরিয়ে ঘুমাতে পাঠান।
সে বহুকাল আগের কথা, শঙ্কর স্বামী নামে এক সাধক এলেন বারাণসীতে। কথিত আছে ভগবান শিব একবার দেবী অন্নপূর্ণার সমস্ত খাদ্যসামগ্রী লুকিয়ে দিয়ে বলেছিলেন তাঁর ক্ষুধা নিবারণ করতে। সেই সময়েই ওই সাধক শঙ্কর স্বামী চাল-ডাল ও বিভিন্ন সবজি দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ভগবানের ক্ষুধা নিবারণ করেন। আর সেই থেকে চলে আসছে এই 'অন্ন ক্ষেত্র', বর্তমানে যার পরিচালনা করছেন সঞ্জয় মহারাজ। উনি চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য, যারা গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মন্দিরটি দেখাশোনা করে আসছেন।
সঞ্জয়বাবু জানান, দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছেই শঙ্কর মহারাজ তীর্থযাত্রীদের দেওয়া দানসামগ্রী দিয়ে খিচুড়ি তৈরি করতেন। সেই খিচুড়ি তিনি অভাবী, দরিদ্র ও গৃহহীনদের মধ্যে বিলি করে দিতেন। আর এইভাবেই শঙ্কর স্বামী লোকমুখে 'খিচুড়ি বাবা' আখ্যা পান। বিশ্বাস করা হত, তাঁর রান্না করা খিচুড়ি ছিল স্বয়ং মহাদেবের আশীর্বাদধন্য প্রসাদ। এমনকি এই প্রসাদ খেয়ে বহু মানুষের জটিল রোগও সেরে যেত বলে ভক্তরা মনে করেন এখনও। সময়ের সাথে সাথে সেই সাধক পরমেশ্বর শিবের অবতার হিসেবে পূজিত হতে থাকেন এবং তাঁর নাম হয়ে যায় ‘খিচুড়ি বাবা’। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের ১ নম্বর গেটের কাছে রয়েছে এই মন্দির। মন্দিরে রয়েছে শঙ্কর স্বামীর আবক্ষ মূর্তি, সাথে রয়েছেন তাঁর শিষ্য হরিহর বাবা।
আজ খিচুড়ি বাবা সশরীরে না থাকলেও, তাঁর শুরু করা এই রান্নাঘর এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি। সঞ্জয়বাবু আরও জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ভান্ডারা। ৮-১০ ধরণের সবজি দিয়ে তৈরি গরম খিচুড়ি পরিবেশন করা হয়। তিন কুইন্টালের বেশি চালের খিচুড়ি প্রায় আড়াই হাজার ভক্তের মধ্যে বিলি হয়, উৎসব-অনুষ্ঠানে এই সংখ্যাটা ছাড়িয়ে হয় পাঁচহাজার। এখন স্বয়ংক্রিয় মেশিনের সাহায্যে খিচুড়ি রান্না করা হয়। এই বিশাল দানযজ্ঞ চলে সম্পূর্ণ ভক্তদের স্বেচ্ছায় দেওয়া দান ও সহযোগিতায়। কারোও কোনো মানত পূরণ হলে মানুষ এখানে ডাল, চাল বা সবজি দান করে যান। সেই দানের জিনিস দিয়ে তৈরি হয় খিচুড়ি, পরম তৃপ্তি ও বিশ্বাস নিয়ে হাজার হাজার মানুষ তা গ্রহণ করেন।