দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা শেষ, দেবীপক্ষেরও অবসান হল। আগামী অমাবস্যাতেই বাংলার ঘরে ঘরে পূজিতা হবেন দেবী কালী। সেদিন শুধু মা একা আসবেন না, সঙ্গে নিয়ে আসবেন সাঙ্গপাঙ্গদেরও। আর মায়ের সহচর বলতে যেটা বোঝায় পাতি বাংলায় তা হল ভূত। অলস দুপুরে চিলেকোঠার এক কোণায়, অথবা বর্ষার রাতে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে হঠাৎ হঠাৎ "তেনারা" হানা দেন আমাদের ঘরে ঘরে। ভূত, প্রতিটি বাঙালির শৈশব, কৈশোর বা বার্ধক্য, বইতে, মুখে মুখে বা হালফিলের অডিও স্টোরিতে আমাদের সাথেই থাকে। ভূত ছাড়া বাঙালির আড্ডা জমে না। ভূতের বৈচিত্রেও বঙ্গদেশীয় ভূতরা বোধহয় এক নম্বরেই। পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, মেছো, আলেয়া, মামদো, শাঁকচুন্নি, চোরাচুন্নি, নিশি, গেছো, একনরে। লিখতে গেলে এই লিস্ট আরও লম্বা হয়ে যাবে। আজ রইল বাংলার কুলীন ভূত ব্রহ্মদৈত্যর গল্প।
বাংলার লোককাহিনি এবং ভূতসমাজে ব্রহ্মদৈত্য কুলীন চরিত্র হিসেবেই পরিচিত। অন্যান্য সাধারণ ভূতেদের মতো এরা ঠিক হিংস্র স্বভাবের হয় না, বরং ভূতকুলে এদের স্থান কিন্তু সবার উপরে। শোনা যায়, কোনো সদাচারী ব্রাহ্মণের যদি অপঘাতে মৃত্যু হয় তবে তাঁর আত্মা ব্রহ্মদৈত্যে পরিণত হয়। বাংলা লোকগাথা বিশেষ করে বাংলা শিশু সাহিত্য ব্রহ্মদৈত্যর বেশ একটা সুন্দর বর্ণনা দিয়ে রেখেছে। পরনে এদের খাটো ধুতি, কাঁধে পৈতে এবং পায়ে খড়ম। হাতে একটি ছড়ি কিংবা হুঁকো থাকতেও দেখা যায় মাঝেমাঝে। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে এই কুলীন ভূতেরা। লোকালয় থেকে দূরে কোনো বেলগাছ কিংবা অশ্বত্থ গাছে দুই ঠ্যাং ঝুলিয়ে দিব্যি বসে থাকেন তারা।
চরিত্রের দিক থেকে ব্রহ্মদৈত্যরা বেশ শান্ত, দয়ালু এবং পরোপকারী। কোনো সৎ বা দরিদ্র মানুষ বিপদে পড়লে এরা অলৌকিক উপায়ে অনেক রকমের সাহায্য করে বলে প্রচলিত বহু গল্প রয়েছে। এমনকি লালবিহারী দে-র বিখ্যাত ফোক-টেলস অফ বেঙ্গল বইয়ের "দ্য ব্রাহ্মণ অ্যান্ড দ্য ঘোস্ট" গল্পে দরিদ্র ব্রাহ্মণকে ব্রহ্মদৈত্যের অলৌকিক বস্তু দিয়ে সাহায্য করার বিবরণ পাওয়া যায়। তবে এরা শান্ত হলেও এদের আত্মসম্মানবোধ প্রবল। ব্রহ্মদৈত্য রেগে গেলে যখন তখন মানুষের ঘাড় মটকে দিতেও দ্বিধা করে না।
যুগের সাথে সাথে গ্রাম-বাংলার এই ভূতরা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। তবুও ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বইয়ের পাতায় ব্রহ্মদৈত্য আজও বাঙালির শৈশবের নস্টালজিক অংশ হয়ে টিকে রয়েছে। তবে হ্যাঁ সাবধান, সামনে অমাবস্যা, কোনো গাছ থেকে যদি আওয়াজ পান 'কিঁ রেঁ কোঁথায় যাঁচ্চিসলো', সাবধানে দৌড় দেবেন কিন্তু।