২০১১ সালের ১১ই এপ্রিল, লখনউ থেকে দিল্লিগামী পদ্মাবত এক্সপ্রেসের কামরা থেকে একটি মেয়েকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় বাইরে। বছর চব্বিশের মেয়েটি জাতীয় স্তরের ভলিবল প্লেয়ার ছিলেন, সরকারি চাকরির বিষয়েই তাঁর এই দিল্লি যাত্রা ছিল। ট্রেন থেকে বাইরে ফেলে দেওয়ার কারণে, পাশের লাইনে আসা আরেকটি ট্রেন চলে যায় তাঁর বাম পায়ের উপর দিয়ে। ওই অবস্থায় সারারাত লাইনের ধারেই পড়ে ছিলেন তিনি। যন্ত্রণা বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত অবস্থায় ওভাবেই ছিলেন তিনি প্রায় ভোর অব্দি, পাশ দিয়ে তখন চলে গিয়েছে ৪৯ টি ট্রেন। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত খেয়ে যাচ্ছিল 'আশেপাশে থাকা ইঁদুরেরা। পরদিন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে, হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হয় পা-টি। এতটা পড়ে কী ভাবছেন? একটা জলজ্যান্ত স্বপ্নের মৃত্যু হল? তাহলে ভুল ভাবছেন। এই ঘটনাটি পাল্টে দেয় অরুণিমার জীবন।
অরুনিমা সিনহা, উত্তরপ্রদেশের আম্বেদকর নগরের মেয়ে, বাবা ছিলেন একজন আর্মি ইঞ্জিনিয়ার। ছোট বেলা থেকেই খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। স্কুল ও কলেজে ভলিবলে জাতীয় স্তরে প্রতিনিধিত্বও করেছেন তিনি। স্নাতকোত্তর শেষ করে সিআইএসএফ-এ চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন অরুনিমা। সেই চাকরি প্রায় হয়েও গেছিল, কিছু জটিলতার কারণে সেটি আটকে থাকার কারণে ১১ই এপ্রিল দিল্লি যাচ্ছিলেন তিনি। আর সেই সময়েই ট্রেনে ছিনতাইকারীরা হামলা চালায়, অরুণিমার গলার সোনার চেনটির দিকে নজর পড়ে তাদের। কিন্তু অ্যাথলেটিক চেহারা হওয়ার জন্য বেগ পায় ছিনতাইকারীরা। কিন্তু শেষ অব্দি লড়েও রক্ষা হল না, তাকে ট্রেনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল হামলাকারী দলটি।
এই অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যখন আর পাঁচজন সাধারণ মানুষ নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে, অরুনিমা তখন দেখছিলেন এক অসম্ভব স্বপ্ন। সংবাদমাধ্যমে তখন জাতীয় স্তরে চর্চায় অরুনিমা। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে বার বার এ দেশে প্রশ্ন উঠেছে, আর সেই প্রশ্নের একটি অংশ অরুনিমাও ছিল। বিপাকে তখন সরকারও, এর মধ্যে শুরু হয় তাঁর এই দুর্ঘটনাকে নিয়ে নানা গুজব, কারোর কথায় এটা নিছক দুর্ঘটনা, আবার কেউ বলছে আত্মহত্যা। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে প্রমাণ করার। অরুনিমা ঠিক করেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করবেন। তিনি যোগাযোগ করেন প্রথম ভারতীয় নারী এভারেস্টজয়ী বাচেন্দ্রী পালের কাছে। বাচেন্দ্রী তাঁকে বলেছিলেন, "তুমি এই অবস্থায় এভারেস্ট চড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই মনে মনে এভারেস্ট জয় করে ফেলেছ। এবার শুধু পৃথিবীকে তা দেখানো বাকি।"
এরপর শুরু হয় কঠোর এবং যন্ত্রণাদায়ক প্রশিক্ষণ। কৃত্রিম পা বা প্রোস্থেটিক লেগ নিয়ে বরফের পাহাড়ে হাঁটা কতটা কষ্টের, তা শুধু তিনিই জানতেন। বহুবার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়েছে, কিন্তু তিনি থামেননি। অবশেষে, ২০১৩ সালের ২১ মে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে অরুনিমা সিনহা বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের তেরঙা পতাকা উড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তিনি হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পুটি, কৃত্রিম পা নিয়ে এভারেস্ট জয় করেন। এখানেই শেষ নয়, অরুনিমা বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ (সেভেন সামিটস) জয় করার লক্ষ্য স্থির করেন এবং এন্টার্কটিকার মাউন্ট ভিনসনসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলো সফলভাবে আরোহণ করেন। তাঁর এই অনন্য কৃতিত্বের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ২০১৫ সালে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
'ওরাও দুর্গা' সিরিজের অরুণিমার এই গল্প, সাহস, সংকল্প ও নিষ্ঠার গল্প। প্রতিকূলতায় নিজের জেদ ও অদম্য সাহসকে বজায় রেখে লক্ষ্যে পৌঁছানোর গল্প। এই সাহস, এই শক্তি শুধু গল্প-ই নয় আরও হাজার হাজার অরুণিমাকে উদ্বুদ্ধ করে, জীবন কোথাও গিয়ে থেমে যায়না। সব পরিস্থিতিই নতুন করে জীবনের গল্প লিখতে পারে।