"কাঁদ শনিচরী, কাঁদ। ওদের সোনাদানা, জমিজমা, ঠাটবাট সব আছে— শুধু চোখে জল নেই। তুই ওদের জল কিনে দে। বড়লোকদের মরণ হলো গরিবের রুটি-রুজির মওকা। ওদের জন্য তোর নিজের বুকের সব ক্ষোভ উগরে চোখের জল বানিয়ে দে।"- মানুষ মারা গেলে দুঃখ হবেই, আর প্রিয়জন চলে গেলে আসে কান্না। কিন্তু কান্নার জন্য লোক ভাড়া করে নিয়ে আসা হয় আমাদের দেশেই। রাজস্থান, মরু শহরের বহু পুরানো এক প্রথা বা পেশা, রুদালি। খুব সোজা কথায় বলতে গেলে এই পেশার সাথে যুক্ত নারীরা পয়সার বিনিময়ে জমিদার বা রাজবাড়ি গুলোতে মৃত্যুর পরে কাঁদতে আসেন। এটি এমন এক পেশা যেখানে অন্যের মৃত্যুতে নিজের চোখের জল বিক্রি করে দুমুঠো ভাতের সংস্থান করতে হয় নিম্নবর্ণের নারীদের।
জাতপাত বা বর্ণভেদ রাজস্থানে নতুন নয়, আজ বিংশ শতাব্দীতেও এই প্রথা সমানে চলে আসছে। মরু শহরের কথা আসলেই চোখের সামনে রাজকীয় দুর্গ, রঙিন উৎসব আর বালুকাময় মরুভূমি ভেসে উঠলেও, এই ঐতিহ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ও নির্মম সামাজিক বাস্তবতার ইতিহাস। রাজস্থানি ভাষায় ‘রুদালী’ শব্দের অর্থ হল ‘রোদনকারী নারী’ বা যে নারী কেঁদে বেড়ায়। যুগ যুগ ধরেই রাজস্থানের সমাজব্যবস্থায় বর্ণপ্রথা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল ভয়ঙ্কর রকমের। রাজপরিবার বা উচ্চবর্ণের কোনো সদস্য মারা গেলে সেই বাড়ির নারীরা ঘরের বাইরে এসে বা পরপুরুষের সামনে কান্না প্রকাশ করতে পারতেন না, কারণ তাদের মর্যাদা ও আভিজাত্য ধরে রাখতে পর্দার আড়ালেই থাকতে হত। কিন্তু সমাজে মৃত ব্যক্তির প্রতি শোকের গভীরতা বোঝানোটাও অনেক বেশি জরুরি ছিল। এই কারণেই ভাড়া করা হতো সমাজচ্যুত নিম্নবর্ণের নারীদের, যারা মৃত ব্যক্তির বাড়িতে এসে বুক চাপড়ে, মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে এবং সুর করে বিলাপ করতেন, যা উচ্চবর্ণের ধনী সমাজে প্রতিপত্তি জাহিরের পন্থা ছিল।
রুদালির সাধারণত কালো রঙের পোশাক পরতেন, যা মৃত্যুর দেবতা যম বা কাল কে নির্দেশ করে। দীর্ঘ ঘোমটার আড়ালে তারা লুকিয়ে রাখতেন নিজেদের মনের কান্না। অস্পৃশ্যতার কারণে গ্রামের মধ্যে তাদের বসবাসের অধিকার ছিল না। সমাজ তাদের দাগিয়ে দিয়েছিল ‘অপয়া’ বলে। অথচ উচ্চবর্ণের জমিদার বা রাজবাড়িতে শোকের সময় ঠিকই তাদের ডাক পড়ত তাদের। যে চোখের জল তারা অন্যের বাড়ির উঠোনে টাকার বিনিময়ে ফেলতেন, সেই জল নিজেদের জীবনের চরম দুঃখেও ঝরাতে পারতেন না। অত্যন্ত সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে রুদালির কাজ করতেন, যেখানে কয়েক দশক আগেও একটি লাশের পাশে কান্নার জন্য তারা মাত্র কয়েক টাকা, মৃত ব্যক্তির পুরোনো জামাকাপড় অথবা অল্প কিছু খাবার পেতেন। কান্নার তীব্রতা যত বেশি হতো, রুদালিদের পারিশ্রমিকও কিছুটা বাড়ত।
সময় যত এগিয়েছে, কালের নিয়মে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই প্রথাটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। রাজতন্ত্র প্রায় লোপ পাওয়ার ফলে এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই সকলেই প্রায় ব্যক্তিগতভাবে শোক প্রকাশ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, ফলে রুদালিদের কাজের পরিধি একেবারেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে এই পেশার সাথে যুক্ত অনেকেই দিনমজুরি বা কৃষিকাজ বেছে নিচ্ছেন। তবে এই প্রথা ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় রেখে গেছে অনেক বড় ক্ষত। এতটাই ক্ষত যে, নারীদের নিজস্ব আবেগকেও বেঁচে থাকার তাগিদে পণ্যে রূপান্তরিত করতে হয়েছিল।