Calcutta Television Network

গড় ভবানী থেকে ত্রাণনাথ কালীবাড়ি, বাংলার শাক্ত আরাধনার এক সুপ্রাচীন নিদর্শন

গড় ভবানী থেকে ত্রাণনাথ কালীবাড়ি, বাংলার শাক্ত আরাধনার এক সুপ্রাচীন নিদর্শন
8 October 2026 • 07:13:39 pm

কলকাতা কালীক্ষেত্র আর বঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী স্বয়ং মা কালী। যদি বলা হয় কালীঘাটে ওনার হেড অফিস, তাহলে গোটা বঙ্গ জুড়েই শক্তি আরাধনার সাক্ষী হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র কালী মন্দির। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গঙ্গার তীর ঘেঁষে রয়েছে এরকম অনেক মন্দির, যারা বয়ে নিয়ে চলেছে যুগ যুগের ইতিহাস। এরকমই উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে গঙ্গার তীরে অবস্থিত ত্রাণনাথ কালীবাড়ি শুধু একটি মন্দিরই নয়, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। 


স্থানীয়দের কাছে এটি ‘ভবানী কালীমন্দির’ বা ‘ত্রাণনাথ বাবুর কালীবাড়ি’ নামেও পরিচিত। এই মন্দিরের উৎপত্তির ইতিহাস খুঁজতে আমাদের চলে যেতে হবে সেই ত্রয়োদশ শতকে। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বেড়াচাঁপার তৎকালীন রাজা চন্দ্রকেতু পানিহাটি অঞ্চলে একটি দুর্গ বা গড় নির্মাণ করেন   এবং সেখানে মা ভবানীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে তন্ত্র মতে পূজা শুরু করেন। সেই কারণে পরবর্তীকালে  উত্তর পানিহাটির এই অংশটি ‘গড় ভবানী’  নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে বিদেশি শক্তির আক্রমণে রাজপরিবারের পতন ঘটলে দীর্ঘকাল দেবীমূর্তিটি ছিল বাগবাজারে জনৈক গাঙ্গুলী পরিবারে। পরে পানিহাটির এক ধনী ব্যক্তি ত্রাণনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই মূর্তি এনে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মায়ের পূজা শুরু করেন। 

অন্য একটি মতে, রাজা চন্দ্রকেতু বেড়াচাঁপাতেই মায়ের পূজা শুরু করেন। সেখানে বহিরাগতের আক্রমণের ফলে রাজপরিবারের সকলের মৃত্যু হলে, রাজপুরোহিত দেবী মূর্তিকে লুকিয়ে নিয়ে আসেন পানিহাটিতে। গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই গঙ্গাতীরেই মায়ের পূজা শুরু করেন এই পুরোহিত। পরবর্তীকালে এই পূজার দায় গিয়ে বর্তায় ত্রাণনাথ বাবুর পিতা নসীরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে। পরবর্তী কালে আনুমানিক ১৮৮০ সালে পাট ব্যবসায়ী ত্রাণনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান এই মন্দির নির্মাণ করে দেবীর আরাধনা শুরু করেন। তাঁর এই মহৎ কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরবর্তীকালে এই মন্দিরটি  ‘ত্রাণনাথ কালীবাড়ি’ এবং সংলগ্ন ঘাটটি ‘ত্রাণনাথ বাবুদের ঘাট’ নামে খ্যাতি লাভ করে। 


স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে দক্ষিণমুখী মূল মন্দিরটি প্রথাগত বাংলার ‘পঞ্চরত্ন’ শৈলীতে নির্মিত। উঁচু বেদির ওপর ত্রিখিলান প্রবেশপথ এবং খাঁজকাটা রেখ ঘরানার পাঁচটি শিখর দূর থেকেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। মূল গর্ভগৃহে  সিংহাসনে মা ভবানীর সেই কষ্টিপাথরের মূর্তিটি নিত্যপূজিত হয়, যার পায়ের নিচে শায়িত রয়েছেন শবরূপী মহাদেব। মূল মন্দিরের পাশেই রয়েছে তিনটি আটচালা শিবমন্দির, যেখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

গঙ্গার শান্ত হাওয়া আর সবুজ গাছপালায় ঘেরা এই মন্দিরের পরিবেশ পুণ্যার্থীকে মুহূর্তের মধ্যে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। প্রতি বছর দীপান্বিতা কালীপূজা এবং অন্যান্য তিথিতে এখানে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মা-কে দর্শনের জন্য। বহু ইতিহাসকে বুকে করে নিয়ে চলা প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি আজও পানিহাটি তথা সমগ্র বাংলার শাক্ত আরাধনার নিদর্শন হয়ে থেকে গেছে। 

×
  • CTVN