Calcutta Television Network

"দাদা আস্তে চালান, স্বর্গে জায়গা কম": লরি বা বাসের পিছনে এইসব লেখার ইতিহাস কী?

"দাদা আস্তে চালান, স্বর্গে জায়গা কম": লরি বা বাসের পিছনে এইসব লেখার ইতিহাস কী?
8 October 2026 • 05:48:32 pm


'দাদা আস্তে চালান, স্বর্গে জায়গা কম'- লম্বা জ্যামে আপনি গাড়িতে বসে আছেন, আর সামনের একটি পণ্যবাহী ট্রাকের পিছনে এই দু-লাইন দেখে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। পিচঢালা দীর্ঘ রাস্তা ধরে দানবের মত সাই-সাই গতিতে ছুটে চলেছে ট্রাকগুলি। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, ট্রাকের পিছনে লেখা থাকে অনেক কিছুই। হিন্দি, বাংলা বা ইংরেজি, মোটামুটি সব ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। HORN OK PLEASE বা শুধুই  OK, আবার হিন্দিতে 'সাইয়া তুম কব্ আয়োগে' বা ফুয়েল ট্যাংকের উপরে লেখা থাকে 'বেশি খেয়োনা, বাবু বকবে', শুরু করলে আর শেষ করা যাবে না। কখনো গুরুগম্ভীর দর্শন আবার কখনো নিছকই চটুল হাস্যরস বা কোনো কথ্য প্রবাদ, শুধুই রঙ-তুলির আঁচড় নয় বরং ফুটিয়ে তোলা হয় যাপন। 


ট্রাকের পিছনে 'OK' লেখার ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। শোনা যায় যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ভয়ঙ্কর বৃদ্ধির জন্য অনেক পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক ডিজেলের সাথে কেরোসিন মিশিয়ে ব্যবহার করত। কেরোসিন দ্রুত দাহ্য বলেই, সতর্কবাণী হিসাবে লেখা হত OK, যার মানে করলে দাঁড়ায় On Kerosene, শুধু দুর্ঘটনা এড়ানোর সতর্কমূলক ব্যবস্থা হিসেবেই, এই OK লেখা থাকতো। সেই সময় ট্রাকগুলিতে ভালো লুকিংগ্লাস বা রেয়ার-ভিউ মিরর না থাকার কারণে নিয়ম ছিল পেছনের গাড়ি ওভারটেক করতে চাইলে হর্ন বাজাবে ("Horn Please")। ট্রাকের চালক যদি দেখতেন সামনে থেকে কোনো গাড়ি আসছে না এবং রাস্তা পরিষ্কার আছে, তখন তিনি পেছনের গাড়িকে ওভারটেক করার সবুজ সংকেত দিতে ট্রাকের পিছনে  লাইট জ্বালিয়ে দিতেন, যার উপরে লেখা থাকতো "OK"। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতেই, এটা চালু করা হয়। তবে এ ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত, অন্তত পিছনে ঘাটলে তাই দেখা যায়। Use dipper at night- শুনলে অনেকেই ভাবতে পারেন যে রোড সেফটির জন্য গাড়িতে লো-বিম হেডলাইট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটু এদিক-ওদিক খোঁজ নিলে জানা যায়, ট্রাকচালকদের মধ্যে এইডস রোগ আটকাতে টাটা মোটরস বাজারে নিয়ে আসে dipper কন্ডোম। ডবল মিনিং এই লাইনটি দিয়ে ব্র্যান্ড প্রচার করা হত সেই সময়ে। 

 

যদিও ট্রাক বা বাসের পেছনে এসব লেখার মূল উদ্দেশ্যই ছিল, পেছনে থাকা গাড়িকে সতর্ক করা এবং যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, কিন্তু এসব লেখা সৃষ্টি করে যায় নানা অনুভূতির যা আমাদের হাসায়, মন ভালো করে। 'বেশি খেলে বাবু বকবে', 'হিংসা করো না, চেষ্টা করো', কিংবা 'দেখবি জ্বলবি লুচির মত ফুলবি' বা ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ এসব পড়লেও কোথাও গিয়ে আমাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি চলেই আসে।  অনেক সময় থাকে চালকের নিজস্ব ভাবনা বা ট্রাফিক সচেতনতার বার্তা- ‘মায়ের আশীর্বাদ’, ‘বাবা-মায়ের দোয়া’, অথবা পথচলতি গাড়িকে সাবধানে যাওয়ার সতর্কতা দিয়ে লেখা থাকে ‘ধীরে চলুন, জীবন মূল্যবান’ বা ‘বড় গাড়ি, সাবধানে ছাড়ি’। 

এক ট্রাক ড্রাইভারের বয়ানে, "অনেকেই ভাবেন আমরা রসকষ হীন, সারাদিন গাড়ি চালাই। কিন্তু আমাদের মনেও কোথাও না কোথাও রসবোধ রয়ে গেছে, ওটাকে মরে যেতে দিলে খুব মুশকিল হবে।" লরি বা বাসের পেছনের ওই  লেখাগুলো কেবল কালি-রঙের কারসাজি নয়। এগুলো হল আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ।  যতদিন চাকা ঘুরবে, হাইওয়ের অন্ধকার চিরে হেডলাইটের আলোয় ভেসে উঠবে 'আগে গেলে বাঘে খায়', ততদিন এই লরির পেছনের লেখাগুলো আমাদের মনের জানালায় এক টুকরো রোদ হয়ে লেগে থাকবে।

×
  • CTVN