Calcutta Television Network

জেনজির ভাষ্য ও হাস্যরস

জেনজির ভাষ্য ও হাস্যরস
9 October 2026 • 02:19:13 pm

বাস্তু গুনা হুইয়া। যার কোনো অর্থ নেই। আবার তাই প্রতিবাদে ভাষা পায় জেনজির কণ্ঠে। ক্ষমতার হাতে লাঠি থাকে, রাষ্ট্রের হাতে থাকে আইন, আর মানুষের হাতে? কখনও প্ল্যাকার্ড, কখনও মুঠোফোন, কখনও নিছক একটা ছুঁড়ে দেওয়া হাসি। সেই হাসির ধার কতটা, তা বুঝতে হলে যন্তর মন্তরের দিকে তাকানো যেতে পারে। সেখানে রাস্তায় নেমে আসা একদল তরুণের হাতে শুধু বিক্ষোভের পোস্টার ছিল না, ছিল রসিকতা, শব্দের খেলা, মিম আর এমন কিছু ক্যাচলাইন, যা দেখে কেউ হেসেছেন, কেউ বিরক্ত হয়েছেন, আবার কেউ হয়তো অস্বস্তিতে মুখও ফিরিয়েছেন। কারণ, সব হাসি আনন্দের নয়। কিছু হাসি সরাসরি ক্ষমতার মুখে ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন। জেন জি-র বিক্ষোভে রসবোধের এই বিস্ফোরণকে নিছক খিল্লি বলে উড়িয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তাতে একটা জটিল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। যে প্রজন্মের জীবনে ইন্টারনেট কোনও আলাদা দুনিয়া নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেরই সম্প্রসারণ, তাদের প্রতিবাদের ভাষাও যে খানিক আলাদা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাদের ফোনের পর্দায় একই সঙ্গে জায়গা করে নেয় বন্ধুর জন্মদিনের ছবি, পছন্দের অ্যানিমের চরিত্র, প্রাক্তনের স্টোরি, চাকরির বিজ্ঞাপন আর রাষ্ট্রের কোনও বেনিয়মের সংবাদ। ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝখানে যে দেওয়াল একসময় অনেকটা উঁচু ছিল, ডিজিটাল দুনিয়ায় তা ক্রমশ ভঙ্গুর।

ফলে রাজনীতি তাদের কাছে কেবল নির্বাচনী ইশতেহার কিংবা নেতাদের দীর্ঘ বক্তৃতা নয়। রাজনীতি মানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, আর সেই সবের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাবানদের নির্বিকার মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার অংশ। সেই মুখের সঙ্গে যখন নিজেদের অভিজ্ঞতার কোনও মিল খুঁজে পায় না তরুণেরা, তখন জন্ম নেয় রসবোধক ব্যঙ্গ, হিউমার। যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, তাকে কখনও কখনও কৌতুকের ছদ্মবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

যেমন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে এক তরুণীর স্যানিটারি প্যাডে সাঁটানো পোস্টার— ‘কোশ্চেন যেভাবে লিক হচ্ছে, আমার প্যাডও অত লিক হয় না।’ কিংবা ‘NEETFLIX: re-exam in every season।’ একটি পরিচিত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের নামের সঙ্গে পরীক্ষার পুনরাবৃত্তিকে জুড়ে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে নিখুঁত শব্দের খেলা। ‘লিকইট, ইন্ডিয়া’জ ফাস্টেস্ট ডেলিভারি সার্ভিস: কোশ্চেন পেপারস’— এই বাক্যে আবার ব্লিঙ্কইটের দ্রুত পরিষেবার পরিচিত ধারণাকে খানিক উল্টে দেওয়া হয়েছে। হাসির আড়ালে অভিযোগটি স্পষ্ট। যে ব্যবস্থার দায়িত্ব ছিল পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সেই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে।

কেউ লিখেছেন, ‘এই বিক্ষোভ তো আমাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা!’ কেউ হাতে সাদা কাগজ তুলে বলেছেন, ‘আসলে যা পেলাম।’ কোথাও গব্বর সিংয়ের সংলাপের অনুকরণ শোনা যাচ্ছে, কোথাও জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজের চরিত্রদের মিছিলের ভাষায় এনে হাজির করা। এই সব কিছুর মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে, পরিচিত সাংস্কৃতিক উপাদানকে ব্যবহার করে অপরিচিত রাজনৈতিক অসংগতিকে সহজবোধ্য করে তোলা। এটাই জেন জি-র রসবোধের বিশেষত্ব। তাদের কাছে পপুলার কালচার নিছক বিনোদন নয়, প্রতিবাদের অভিধানও। যে অভিধানে বাংলা সিনেমার সংলাপের পাশে জায়গা পায় হলিউডের সুপারহিরো, জাপানি মাঙ্গা, অ্যানিমে, ভিডিও গেম এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট মিম। একদিকে পরেশ রাওয়াল, অন্যদিকে আয়রনম্যান কিংবা স্পাইডারম্যান। স্থানীয় ক্ষোভ প্রকাশের জন্য তাদের ধার করতে হয় না কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য। নিজেদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকেই তারা তৈরি করে নেয় নতুন বাক্যবন্ধ। অবশ্য এই প্রবণতা একেবারে নতুন নয়। হাসির মধ্যে দিয়ে ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলার ইতিহাসও বহু পুরনো। ছয়ের দশকে যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের স্লোগান ছিল, ‘যুক্তফ্রন্টে কী পেলাম/ গুলি-বুলি-লাল সেলাম।’ তার পাল্টা স্লোগানে বাম শিবিরও ছন্দ ও ব্যঙ্গের আশ্রয়কারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে উপাচার্যের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে, ‘ভিসি তুমি দুষ্টু লোক/ তোমার মাথায় উকুন হোক।’ কখনও গন্ডারের ছবি এঁকে তার নীচে লেখা হয়েছে প্রণামের কথা। আবার প্রশাসনের সমালোচনায় জনপ্রিয় টেলিভিশন চরিত্রকে টেনে এনে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসন তুমি জুন আন্টির চেয়েও খারাপ!’

অর্থাৎ, প্রতিবাদের মঞ্চে খিল্লির প্রবেশ জেন জি-র হাত ধরে প্রথম ঘটেনি। বদলেছে তার মাধ্যম, গতি এবং বিস্তারের পরিসর। আগে একটি পোস্টার কয়েকটি দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একটি ছবি কয়েক মিনিটের মধ্যে শহর ছাড়িয়ে দেশ, এমনকি মহাদেশ পেরিয়ে যেতে পারে। আগে স্লোগান মুখে মুখে ফিরত, এখন তা স্ক্রিন থেকে স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ে। একটি মিমের আয়ু হোক না কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টাতেই সেটি পৌঁছে যেতে পারে লক্ষ মানুষের কাছে।

×
  • CTVN