অনিন্দ্য বিশ্বাস: যদিও আকাশের মুখ ভার সকাল থেকেই, কিন্তু রাত পোহালেই সূচনা হয়ে যাবে বাঙালির প্রাণের উৎসবের। দুর্গাপূজা মানেই শরতের নীল আকাশ, ছাতিমের গন্ধ, শিশির মাখা শিউলি আর তেপান্তরে কাশের দোলা। প্রতি বছরই এগুলো ফিরে আসে কিন্তু প্রতিবার-ই তারা আসে নতুন করেই। আর এসের সাথেই স্মৃতিতে চেপে বারবার ফিরে আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গমগমে গলায়- 'অশ্বিনের শারদপ্রাতে...', বাঙালির চিরাচরিত অনুষ্ঠান 'মহিষাসুরমর্দ্দিনী', বোঝা যায় ওই পূজা আসছে। মহালয়া তিথি শুভ না অশুভ, এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। সেই আলোচনা আরেকদিন হবে। তবে বাঙালির মহালয়ার ভোর শুরুই হয় এই মহিষাসুরমর্দ্দিনী অনুষ্ঠান দিয়েই। ১৯৩১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান ৯৫ বছর ধরে বাঙালির একান্ত নিজস্ব সম্পদ। রেডিও জামানা থেকে স্মার্টফোন, ঘরে ঘরে আজও রয়ে গেছেন বাণীকুমার, পঙ্কজ মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আজ রেডিও ছাড়িয়ে ইউটিউবে বা স্পর্টিফাইতে জায়গা করে নিয়েছে এই অনুষ্ঠান।
প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে আমরাও পাল্টেছি নিজেদের। সেই সঙ্গে পাল্টে গেছে আমাদের চাহিদা, জীবনধারণ। একটা সময় ছিল যখন মহালয়ার আগের রাতে বাড়ির বড়রা রেডিও ঠিকথাকে করে রাখতেন। ভোর চারটে বাজার আগেই ঘুম থেকে গোটা পরিবার বসে পড়ত রেডিওকে ঘিরে। তারপর ঘড়িতে ভোর চারটে বাজলেই...সে এক নস্টালজিয়া বটে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সেই জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন আর মিউজিক স্ট্রিমিং অ্যাপস। এখন অনেকেই ভোর চারটেয় ঘুম থেকে ওঠার বাধ্যবাধকতাতে থাকেননা, নিজের সুবিধা মত হেডফোন কানে গুঁজে বা গাড়িতে যাতায়াতের পথে শুনে নেন মহিষাসুরমর্দ্দিনী। তবে সময় বা প্ল্যাটফর্ম, সব বদলে গেলেও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মহাশয়ের সেই গমগমে কণ্ঠস্বরের চাহিদা আজও একই থেকে গেছে।
এখন মহালয়ার ভোর শুরুই হয় সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছাবার্তা, ছবি সাথে রিলস। পুরানো ছবি বা মহিষাসুরমর্দ্দিনী অনুষ্ঠান শোনা নিয়ে স্টোরি দেওয়া কিংবা গঙ্গার ঘাটে তর্পণের ছবি ‘লাইভ’ করা এখন নতুন প্রজন্মের ট্রেন্ড। যারা কর্মসূত্রে বা পড়াশোনার জন্য প্রবাসে থাকেন, তাদের কাছে কিন্তু এই ডিজিটাল মাধ্যমগুলোই জুড়ে রাখে নাড়ির সাথে। টেকনোলজির কল্যাণে সুদূর আমেরিকা বা ইউরোপে বসেও একজন বাঙালি কলকাতার গঙ্গার ঘাটের তর্পণ বা কুমারটুলির লাইভ ভিডিও দেখে অনুভব করতে পারেন, হ্যাঁ পূজা আসছে।
টিভির যুগ শুরু হওয়ার পরে কিছুটা রেডিও কিছুটা ফিকে হলেও সেই নস্টালজিয়া এখনো জৌলুস হারায়নি। একটা সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় চালু হল মহিষাসুরমর্দ্দিনী অনুষ্ঠান, তুলে ধরা হল দেবী দুর্গার অসুরবধের দৃশ্য। সেই ক্রেজও কিন্তু পাল্লা দিয়ে সমানে চলছে। তবে সেখানেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। গ্রাফিক্স, ভিএফএক্স এবং থ্রিডি অ্যানিমেশনের সাহায্যে মা দুর্গার অসুর বধের দৃশ্যগুলোকে এখন আরও বেশি আকর্ষণীয় ও বাস্তবসম্মত করে তোলা হয়েছে। কোন চ্যানেলে কোন তারকা এবার ‘দেবী দুর্গা’ সাজছেন, তা নিয়ে মহালয়ার এক মাস আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় টিজার এবং ট্রেলার নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে যায়। সেই ট্রেন্ডে গা ভাসান জেন আলফা থেকে সত্তরের বৃদ্ধ।
ডিজিটাল যুগ বা প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মহালয়ার মূল আবেগকে এখনো হারিয়ে যেতে দেয়নি। বলা ভালো, প্রযুক্তি এই ঐতিহ্যকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিয়েছে নতুন প্রজন্মের কাছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো পরিবারের সাথে বসে বা চাদর মুড়ি দিয়ে রেডিও শোনে না, কিন্তু তারা ঠিকই ভোরবেলা ইনস্টাগ্রাম রিলসে বা ছবিতে অডিও ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করে নিজেদের মতো করে উৎসবকে স্বাগত জানায়। বাঙালির পুজোর আবেগ চিরকাল একই থাকবে। রেডিওর সেই সোনালী দিনগুলো আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চলে এলেও মহালয়ার ভোরের সেই আবেগ, অনুভব আর ঢাকের আওয়াজ আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্পন্দিত হয়।