অলস দুপুরে চিলেকোঠার এক কোণায়,অথবা বর্ষার রাতে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে হঠাৎ হঠাৎ "তেনারা" হানা দেন আমাদের ঘরে ঘরে। ভূত,প্রতিটি বাঙালির শৈশব, কৈশোর বা বার্ধক্য, বইতে,মুখে মুখে বা হালফিলের অডিও স্টোরিতে আমাদের সাথেই থাকে। ভূত ছাড়া বাঙালির আড্ডা জমে না। মজার জিনিস হলো,এই বাঙালি জাতি যেমন খাদ্যরসিক,একটু খুঁটিয়ে দেখলে বাঙালি ভূতেদেরও খাওয়া নিয়ে একটা অদ্ভুত রসনা আছে। যদিও প্রচলিত মতে, ভূত ঘাড় মটকে রক্ত খায়,তাই হলপ করে বলাই যায়, পৃথিবীর অন্য কোনও সংস্কৃতিতে ভূতেরা এতটা খাদ্যরসিক নয়। ভয় আর ভোজনের অদ্ভুত মেলবন্ধনে বাংলার ভূত এখনও অনন্য।
ভূতের বৈচিত্রেও বঙ্গদেশীয় ভূতরা বোধহয় এক নম্বরেই। পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, মেছো, আলেয়া, মামদো, শাঁকচুন্নি, চোরাচুন্নি, নিশি,গেছো, একনরে। লিখতে গেলে এই লিস্ট আরও লম্বা হয়ে যাবে। এবার এরা যে শুধু ঘাড় মটকে রক্ত খায় তা কিন্তু না। এই ধরুন না, মেছোকেই, নামেই মাছ আছে। মাছে-ভাতে বাঙালির মতোই এরাও মাছ খেতে ভালোবাসে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, ভর দুপুর হোক বা নিঝুম রাত কাঁচা মাছ নিয়ে কেউ এনার সামনে দিয়ে গেলেই, "এই একটা মাছ দিয়ে যা না"-বলে বায়না জুড়ে দেয়। এবার মাছ না দিলে, মেছো কারোর ঘাড় মটকেছে কি না,সেটা অবশ্য জানা নেই। কথায় আছে সধবা মহিলা মারা গেলে,ওরা হয় শাঁকচুন্নি,ঠাঁই হয় কোনও উঁচু গাছে। বাংলার গ্রামে এদের নাকি গাছের থেকে ঠ্যাং দোলাতেও দেখা যায় মাঝে মাঝে। এদেরও মাছের প্রতি অদ্ভুত টান আছে। তবে কাঁচা না ভাজা মাছ। মাছ ভেজে রান্নাঘর থেকে আড়াল হয়েছেন কি, টুক করে এক পিস্ গায়েব। ভূতেদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত ভূত ব্রহ্মদৈত্য। লোককথা আছে,ব্রাহ্মণ মরলে ব্রহ্মদৈত্য হয়। লম্বা ঠ্যাং,ধুতি,গলায় পৈতে,থাকে সাধারণত বেল গাছে। কিন্তু এরা কট্টর ভেজিটেরিয়ান। গোয়াল থেকে খাঁটি দুধ গায়েব করে দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। এছাড়াও কোথাও কোথাও ঘি মিষ্টি দিয়েও এদের অতৃপ্ত আত্মাকে শান্ত করার প্রচলন আছে। এবার সত্যিই এরা এসব খায় কি না,তা দেখার সাহস বোধহয় আজও কারোর হয়নি।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলার ভূতেরা শুধুই রক্ত খায়না। তাই লোকমুখে, সাহিত্যে এদের নিয়ে আতঙ্কের থেকে বেশি রসিকতাই উঠে আসে। মাছের লোভে মেছো ভূতের কান্নাকাটি বা গৃহস্থের হেঁসেলে ঢুকে পেত্নীর হাড়ি চাপড়ানোর ঘটনা, যত না ভয় জাগায় তার চেয়েও বেশি কৌতূহল তৈরী করে। অনেক গল্পেই,কোনও এক চতুর গৃহস্থ,বা কোনও সাধারণ জেলে, একটা মাছের টুকরো বা বুদ্ধির জোরে এদের বোকা বানিয়ে দেয়। এই গল্প গুলোতে,ভয়ের থেকে রসবোধই বেশি প্রকাশ পায়।
সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যদের একাংশের মতে, ভূতেদের এই খাওয়ার লোভ তৎকালীন গ্রাম-বাংলার চরম দারিদ্র ও দুর্ভিক্ষের প্রতিফলন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য সংকুলান, গ্রাম বাংলার বেশিরভাগ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছিলো। মাছ বা মিষ্টির মতো পুষ্টিকর খাওয়ার ছিল নাগালের বাইরে। সাথে ছিলো অপুষ্টি ও খাওয়ারের অভাবে মৃত্যু। মানুষের এই অপূর্ণ আকাঙ্খা ও ক্ষুধার অতৃপ্তিই রূপ নিলো অতৃপ্ত আত্মায়, যারা অশরীরী হয়েও খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়।
আজকের কর্পোরেট যুগে, ফ্ল্যাট কালচারে বেলগাছও নেই, মেছো ভূতের কান্নাও শোনা যায়না। কিন্তু তেনারা আজও আছেন, আমাদের মুখে মুখে,সাহিত্যে, সিনেমায়। বইয়ের পাতায় ওরা থেকে গেছে আমাদের শৈশব বা কৈশোর হয়ে, না ভয় নয় আমাদের খাদ্য ও আর্থ সামাজিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে।