আজ ষষ্ঠী,শরৎকালীন বার্ষিক দুর্গাপূজার সূচনা হয় এই তিথি থেকেই, চলে টানা দশমীর ঘটে বিসর্জন পর্যন্ত। সপ্তমীর সকাল থেকে শুরু হয় দেবীর মূল পুজো। মহাস্নান, পূজা, হোম এবং বলিদান এই চারটি কর্ম একসাথে এই পূজায় হয়ে থাকে বলে বার্ষিক শরৎকালীন দুর্গাপূজাকে মহাপূজা বলা হয়ে থাকে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান একটি আচার হলো দেবীর মহাস্নান। সপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথিতে এই স্নান পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। দেবীর সামনে থাকা দর্পণ প্রতিবিম্বের ওপর বিভিন্ন পবিত্র উপাদান অর্পণ করে মহাস্নান সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। এই আচারের মূল উদ্দেশ্য প্রকৃতির সমস্ত বস্তুকে একীভূত করে আদিশক্তি মহামায়ার আবাহন করা। শাস্ত্র মতে, দেবীকে স্নান করাতে প্রায় ৩৫ ধরনের সামগ্রী প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো গঙ্গাজল, মহাসমুদ্রের জল, বৃষ্টির জল, সরস্বতী নদীর জল এবং পদ্মরেণু মিশ্রিত জল। শুধু জলই নয়, স্নানের উপচারে লাগে পঞ্চগব্য (গোমূত্র, গোময়, দুগ্ধ, দধি, ঘৃত), পঞ্চ কষায় (জাম, শিমূল, বেড়েলা, বকুল ও টোপাকূলের ছাল), কুশ জল, চন্দন, মধু এবং আখের রস। এছাড়া, সমাজের সর্বস্তরের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বেশ্যাদ্বারের মাটি, রাজদ্বারের মাটি সহ মোট ১৭ ধরণের মাটি এই স্নানের উপচারে ব্যবহৃত হয়।
মহাস্নান পর্বের প্রতিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের পাশাপাশি আলাদা আলাদা রাগবাদ্য বাজানোর নিয়ম রয়েছে। যেমন, মালব রাগে বিজয়বাদ্য, ললিত রাগে দেববাদ্য, বিভাস রাগে দুন্দুভিবাদ্য এবং ভৈরব রাগে ভীমবাদ্য। মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও শঙ্খধ্বনিতে পরমা প্রকৃতির স্নান সম্পন্ন হয় । আধ্যাত্মিক ও পরিবেশগত দিক থেকে মহাস্নানের তাৎপর্য কিন্তু অনেকটাই গভীর। এটি শুধু বাহ্যিক শুদ্ধিকরণ নয়, বরং মানুষের মনে থাকা অশুভকে বিনষ্ট করে শুভ-র আগমন। "ওঁ ভূতানি দুর্গা ভুবনানি দুর্গা স্ত্রীয় পশুশ্চ নরশ্চ দুর্গা। যদ্ যদ্ধি দৃশ্যং খলু তদ্ধি দুর্গা দুর্গা স্বরূপাৎ নৈবাস্তি কিঞ্চিৎ।।"- দেবী দুর্গা কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিমা বা রূপ নন, তিনি হলেন সমগ্র সৃষ্টির মূল শক্তি ও পরম ব্রহ্ম আর তাঁর স্নানে ব্যবহার হয় গোটা বিশ্ব চরাচরের উপাদান সামগ্রী।