কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত জায়গা টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন। প্রতিদিন হাজারো চেনা-অচেনা মানুষের দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়ার হুলস্থুল ব্যস্ততা। কিন্তু এই চত্বরে পা রাখলেই হুট করে চোখ আটকে যাবে একটি ছোট্ট দোকানে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে আর পাঁচটা দোকানের মতোই । কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়বে দোকানের গায়ে রং-তুলিতে ছড়ানো হরেক রঙের ক্যারিকেচার, ব্যঙ্গচিত্র আর চটজলদি হাসির ছড়া।
এই অনবদ্য সৃজনশীলতার নেপথ্যে রয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ দে, যাকে অনেকেই ডাকে ঢপেশ্বর মহারাজ’ নামেও। যিনি একাধারে একজন দক্ষ কার্টুনিস্ট আবার একজন চমৎকার কফি-মেকার। কফি, সাথে রয়েছে শিল্পের স্বাদ। গ্রাহকের কাপেই এঁকে দেন ক্যারিকেচার।
শ্যামাপ্রসাদ বাবুর জীবন কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি এই একই জায়গায় বই-ম্যাগাজিন বিক্রি করতেন। সাথে মনে সুপ্ত ইচ্ছে ছিল কার্টুনিস্ট হওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ২০২০ সালের করোনা মহামারি-তে পুরোপুরি ধসে পড়ে ব্যবসা। পরিবারের দায়িত্ব এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই কফি বিক্রি শুরু করেন। তবে পরিস্থিতি বদলালেও নিজের মনের ভেতরের শিল্পীকে তিনি মরতে দেননি। জীবিকার স্বার্থে কফির ফ্লাস্ক হাতে নিলেও অন্য হাতে ঠিকই তুলে নিয়েছেন স্কেচ পেন। আর এভাবেই জন্ম নিয়েছে কলকাতার এই অভিনব ‘কার্টুন ক্যাফে’।
শ্যামাপ্রসাদ বাবুর দোকানে পা রাখলে মনটা মুহূর্তের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। দোকানটিতে সাজানো রয়েছে সাধারণের দৈনন্দিন যাপন এবং সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে আঁকা নানা কার্টুন। আপনি যখন আপনার পছন্দের ভ্যানিলা, মোকা বা চকোলেট কফিতে চুমুক দেবেন, তখন আপনার আবদার অনুযায়ী কাগজের সাদা কাপের গায়েই পেনসিল বা মার্কারের টানে তিনি এঁকে দেবেন চমৎকার ক্যারিকেচার! মাত্র ২০ টাকা থেকে শুরু হওয়া কফির সাথে নিজের একটি স্কেচ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আনন্দটাই আলাদা।
কফির কাপে কার্টুন আঁকানোর জন্য নামমাত্র ৫০ টাকা খরচ করতে হয়, যা শ্যামাপ্রসাদ বাবুর শিল্পীসত্তাকে সামান্য আর্থিক সহযোগিতাও জোগায়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেকেই এখন এই দোকানে ভিড় জমান শুধু কফির কাপে নিজের ক্যারিকেচার ফুটিয়ে তোলার জন্য।
আজকের কর্পোরেট ক্যাফে কালচারের ভিড়ে টালিগঞ্জের এই ফুটপাতের দোকানটি বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালির প্রিয় কার্টুন শিল্পকে। আর শ্যামবাবুর জীবনের গল্প আমাদের বলে, শুধু ইচ্ছে থাকলেই এক কাপ কফির উষ্ণতাতেও ফুটিয়ে তোলা যায় জীবনের ভালো থাকার ক্যানভাস।