২০০৫ সালের এপ্রিল মাস, দিল্লির খান মার্কেট, ১৫ বছরের এক কিশোরীর মুখে ছিটে এল অ্যাসিড। 'ছপাক' একটা আওয়াজ, তারপরেই জ্বলে-পুড়ে গেল ওই কিশোরীর মুখ, সাথে আর্ত চিৎকার। দৃশ্যটা খুব চেনা লাগছে তাই না? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত 'ছপাক' সিনেমার দৃশ্য, চরিত্রের নাম মালতি। অ্যাসিড আক্রমণ থেকে শুরু জীবনের লড়াই, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নিজের জীবন খুঁজে পাওয়ার টানটান গল্প। বাস্তবের 'মালতি'-ও ঠিক একই ভাবে ছাই থেকে বেরিয়ে হয়ে উঠেছিল ফিনিক্স পাখি।
গল্পটা লক্ষ্মী আগরওয়ালের, ২০০৫ সালে যার বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর। খান মার্কেটে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন, তারই বন্ধুর দাদা ৩২ বছরের ইমেল নাঈম মুখে ছুড়ে দিয়ে যায় অ্যাসিড। কারণ লক্ষ্মী তাঁর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গেছে বারবার। সেই রিজেক্ট হওয়ার আক্রোশে সে পুড়িয়ে দেয় লক্ষীর মুখ। যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকা লক্ষ্মীকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। তারপর শুরু হয় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার অদম্য চেষ্টা। সাত বছরে সাতটার বেশি অস্ত্রোপচার আর ভয়ঙ্কর যন্ত্রনা, ভারত তথা গোটা বিশ্বকে দিয়ে গেছে একটা লক্ষীকে।
অ্যাসিড আক্রমণের পর লক্ষ্মীর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। একদিকে শরীরের যন্ত্রনা অন্যদিকে মনের। আয়নায় প্রথমবার নিজেকে দেখে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন তিনি। আত্মীয়স্বজনদের মৃত্যু কামনা, চিকিৎসার বিপুল খরচ, নিজেকে ওড়নার আড়ালেই রাখতে লক্ষ্মী। কিন্তু তিনি হেরে যাননি। ওড়না সরিয়ে নিজের দুর্বলতাকেই করে নিলেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। সেই সময় তাঁর সাথে পরিচয় হয় সমাজকর্মী সাংবাদিক অলোক দীক্ষিতের সঙ্গে। ২০১৩ সালে তিনি যুক্ত হন ‘স্টপ অ্যাসিড অ্যাটাকস’ ক্যাম্পেইনের সাথে। নিজের মতো আরও অনেক 'অ্যাসিড অ্যাটাক সারভাইভার'দের সঙ্গে নিয়ে তিনি যুক্ত হন অলোকের ছাভ ফাউন্ডেশনে। ছাভ এইসব নারীদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং আইনি সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল। লক্ষ্মীরই দায়ের করা এক জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত অ্যাসিড বিক্রির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার নির্দেশ দেয়। সঙ্গে আইনি লড়াই চালিয়ে ইমেল-কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অব্দি পৌঁছে দেন লক্ষী।
২০১৪ সালে লক্ষ্মীর এই অকুতোভয় লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ’ (International Woman of Courage) সম্মানে ভূষিত করে। যে পুরস্কার তৎকালীন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা তাঁর হাতে তুলে দেন। আজকে লক্ষ্মী আগরওয়াল একজন সফল মোটিভেশনাল স্পিকার, সমাজকর্মী, টিভি অ্যাঙ্কর এবং ফ্যাশন মডেল। অপরাধী হয়তো তাঁর মুখ ঝলসে দিতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আর চেতনাকে স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি লড়ে গেছেন। আর সেই যুদ্ধজয়ের গল্পই আরও হাজার হাজার লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে আনছে মৃত্যুর মুখ থেকে।