Calcutta Television Network

'আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক, মাটিতে অবজ্ঞা!'

'আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক, মাটিতে অবজ্ঞা!'
17 September 2026 01:16:00 pm

'পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা, আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক, মাটিতে অবজ্ঞা!' আর চিল চিৎকারে ভোকাট্টা। শরতের নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মত মেঘ আর পূজা পূজা হাওয়াতে বাই-বাই করে আকাশে উড়ে বেড়ায় ঘুড়িগুলো। বাঙালির উৎসবের শুরুটাই হয় বেশ রঙ দিয়ে। রাত পোহালেই বিশ্বকর্মা পুজো, আর নীল আকাশে কেবলই রং-বেরঙের ঘুড়ির মেলা। পাতলা কাগজ আর সরু কাঠি। সামান্য এই সামগ্রী দিয়ে বানানো বস্তুটিই দুদিন ধরে উড়ে বেড়াবে নীল আকাশে। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা আরও হরেক নামের ঘুড়ি এক সময়ে আমাদের শৈশবের অঙ্গ ছিল। যদিও সময়ের সাথে আকাশে ঘুড়ির ঝাঁক অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। আশা করা যায় বিশ্বকর্মা পূজায় এই ঘুড়ি ওড়ানোর চলটা বাঙালির ডিএনএ থেকে কোনোদিনই যাবে না। 

মকর সংক্রান্তি উৎসব হোক বা উত্তরায়ণ কিংবা স্বাধীনতা দিবস উদযাপন বা বাংলার বিশ্বকর্মা পূজা, প্রতিটা উৎসবই ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে উৎসব বা অনুষ্ঠানের সঙ্গে ঘুড়ির সংযোগের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ বা লিখিত বিবরণ নেই। প্রায় ২৮০০ বছর আগে চীনে ঘুড়ির প্রথম উৎপত্তি ঘটেছিল। সময়ের সাথে সাথে এবং সংস্কৃতির আদান প্রদানের ফলে, অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি ঘুড়িও ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছায়। মনে করা হয়, বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের সাথে সিল্ক রুট ধরে ঘুড়ির আমদানি হয়েছিল ভারতে এবং এরপর তা আরব ও ইউরোপীয় দেশ গুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ঘুড়ির লিখিত বিবরণ রয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মারাঠি কবি নামদেবের কবিতায়, তিনি একে 'গুড়ি' বলেছেন এবং উল্লেখ আছে যে ঘুড়িগুলি 'কাগজ' দিয়ে তৈরি করা হত।

মুঘল শাসনকালে, নবাব এবং জমিদারদের হাত ধরে ঘুড়ি ওড়ানোর চল এক রাজকীয় রূপ পায়। সাথে সাথে উন্নত করা হয় ঘুড়ির নকশাও।  সেই সময়কার মুঘল চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে পুরুষ ও মহিলা উভয়কেই ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যায়। শোনা যায়, ১৮১২ সালে এলাহাবাদে তিন বছরের বনবাস শেষে জাহাঙ্গীর দিল্লিতে ফিরে আসার পর, শহরের বাসিন্দারা তাঁর প্রত্যাবর্তনের খুশিকে উদযাপন করতে ঘুড়ি উড়িয়েছিল। ইংরেজ আমলে ভারতে আধুনিক ঘুড়ির উদ্ভব ঘটে, কিছুটা ইউরোপীয় ধাঁচেই নতুন করে তৈরী হয় ঘুড়ি। জানা যায় যে, সাইমন কমিশন গঠিত হওয়ার পরে, 'গো ব্যাক সাইমন' কথাটি লিখে ঘুড়ি উড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল ভারতবর্ষ। সম্ভবত স্বাধীনতা ও ঘুড়ির এই সংযোগই পরবর্তীতে স্বাধীনতা দিবসে ঘুড়ি ওড়ানোর সূচনা করেছিল।

ছবি: এআই

বিশ্বকর্মা পূজা বা মকর সংক্রান্তি মানেই আকাশ জুড়ে চাঁদিয়াল, পেটকাটি, বলমার, মুখপোড়া, মোমবাতির দাপাদাপি। আসুন এক নজরে আকাশে চোখ বুলিয়ে দেখি ঘুড়ি গুলো কেমন ছিল। পেটকাটি, খুব পরিচিত একটি ঘুড়ি। চৌকা আকৃতি দুইভাগ আড়াআড়ি । আর দু-ভাগে থাকে দু রকমের রঙ। মোমবাতির, চৌকা আকৃতি, ঘুড়ির মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত লম্বা চেতকাঠি বরাবর সরু, এক রঙের, দুই দিক অন্য রঙের। চাঁদিয়াল বা তিনপেরে চৌকা আকৃতি ঘুড়ি তিন রঙের হয়ে থাকে সাধারণত। এছাড়াও আরও ঘুড়ি আকাশে ওড়ে, সবার কথা লিখতে গেলে শব্দ কম হয়ে যাবে। 

তবে সময়ের সাথে সাথে এই চেনা ঐতিহ্যে কিছুটা ভাঁটা পড়েছে। নগরায়ণের ফলে খোলা মাঠের অভাব এবং হাইরাইজের ভিড়ে ঘুড়ি ওড়ানোর জায়গা কমে গেছে অনেকটাই। পাশাপাশি মোবাইলের প্রতি তরুণ প্রজন্মের অতিরিক্ত আসক্তি, খেলাধুলা বা এই ঘুড়ি ওড়ানোর মত আউটডোর খেলা গুলির প্রতি অনীহা তৈরী করেছে। ঘুড়ি আসলে আমাদের জীবনকেই বোধহয় তুলে ধরে। সুতোয় বাঁধা থেকেও সে যেমন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে, মানুষও তেমনি নিয়মের বেড়াজালে থেকেও প্রতিনিয়ত মুক্ত চিন্তার ডানা মেলতে চায়। আকাশের বুক থেকে ঘুড়ি যেন কখনো হারিয়ে না যায়, আর ভর দুপুরে যেন একদল ছেলে চিৎকার করে ওঠে 'ভোকাট্টা'।

তথ্যসূত্র: A History of Kite Flying in India, Manan Kapoor



×
  • CTVN