Calcutta Television Network

ট্রাকের কেবিন থেকে পাহাড়ের দৃশ্য, নেহার ক্যামেরায় ধরা পড়ে অন্যরকম জীবন

ট্রাকের কেবিন থেকে পাহাড়ের দৃশ্য, নেহার ক্যামেরায় ধরা পড়ে অন্যরকম জীবন
29 September 2026 05:15:33 pm

ছোটবেলা থেকেই ট্রাকের প্রতি অমোঘ টান তার। বাবাকে ট্রাক চালাতে দেখেই বড় হওয়া। সেই ভালবাসাই এক সময় হয়ে দাঁড়ায় নেহা ঠাকুরের জীবনের পেশা। বিমানসেবিকা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আকাশের বদলে রাস্তাকেই নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। হিমাচল প্রদেশের মন্ডী এই তরুণীর আদি বাড়ি। বর্তমানে তাঁকে হিমাচল প্রদেশের মানুষ প্রথম মহিলা ট্রাকচালক হিসেবেও চেনে। নেহার বাবা মনোজ ঠাকুর দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক ড্রাইভারি পেশার সাথে জড়িত। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ট্রাকে করে দিব্যি এডিকওদিক পৌঁছে যেতেন নেহা। এমনকি স্কুলে পৌঁছানোর সময়ও বহুসময় বাবার ট্রাকই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ফলে বিশাল গাড়িটির সঙ্গে খুব কচি বয়সেই তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। বাবার কাজ দেখেই ধীরে ধীরে জন্মায় ট্রাক চালানোর প্রতি প্রবল আগ্রহ। তবে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে অন্য পেশায় যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন নেহা। স্নাতক হওয়ার পর চণ্ডীগড়ে গিয়ে বিমানসেবিকা হওয়ার প্রশিক্ষণ শুরু করেন। কিন্তু সেই সময়েই বিশ্বজুড়ে বাড়ে কোভিড অতিমারির প্রকোপ। বিমান পরিষেবা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্রশিক্ষণ শেষ করেও সেই পেশায় যোগ দেওয়ার কোনোরকম সুযোগ হয়নি তাঁর। প্রত্যাবর্তন নিজের শহরে। এর পরেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নেহার।

২০২২ সালে, মাত্র ২১ বছর তাঁর বয়স। স্বইচ্ছায় ট্রাকের স্টিয়ারিং হাতে তুলে নেন তিনি। বাবার কাছেই শুরু হয় তাঁর প্রশিক্ষণ। পরিবারও পাশে দাঁড়ায় তাঁর সিদ্ধান্তের। প্রথম দিকে স্থানীয় রাস্তাতেই গাড়ি চালাতেন নেহা। পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর যাত্রাপথের পরিধি। এখন প্রায় ১২ টনের ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে নিয়মিত যাতায়াত করেন তরুণী। নির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য, বিবিধ মালপত্র পৌঁছে দেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। এই কাজ মোটেই সহজ নয়। পাহাড়ি পথে সরু রাস্তা, তীব্র বাঁক, কুয়াশা, বৃষ্টি কিংবা দুর্গম এলাকা পেরোতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ সফরের কারণে অনেক সময় বাড়ির বাইরে রাত কাটাতে হত। খাবারের সময়ও ঠিক থাকে না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তবে এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন নেহা। ট্রাক চালানোর পাশাপাশি নিজের যাত্রাপথের বিভিন্ন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দিও করতে শুরু করেন তিনি। পাহাড়ি রাস্তা, বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো কিংবা ট্রাকে মাল তোলা-নামানোর দৃশ্য উঠে আসে তাঁর ভিডিয়োর বর্ণনায়। তেমনই একটি ভিডিয়োয় তাঁকে এমন একটি দুর্গম রাস্তা দিয়ে ট্রাক চালাতে দেখা যায়, যে পথ সাধারণত বহু চালক এড়িয়ে চলেন। ভিডিয়োটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে।

এরপর থেকেই নেহার অনলাইন দর্শকসংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজের সুযোগও পেয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউটিউবে তাঁর অনুসরণকারীর সংখ্যা সাড়ে চার লক্ষের বেশি। ইনস্টাগ্রামে সেই সংখ্যা আট লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাক চালানোর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া থেকেও বেশ ভালোই আয় করেন ২৫ বছরের নেহা। তবে এত জনপ্রিয়তার পরেও নিজেকে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হিসেবে পরিচয় দিতে একদমই আগ্রহী নন তিনি। তাঁর কাছে ট্রাকচালকের পরিচয়টাই বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নেহার বক্তব্য, অন্যের দেখানো জীবনযাত্রার পিছনে ছুটতে হবে এমন কোনও কথা নেই। নিজের কাজ এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। প্রতিদিন অজানা পথে বেরোলেই নতুন কোনও গল্পের সন্ধান মেলে। নেহার সেই পথচলার নানা মুহূর্ত ইতিমধ্যেই নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং পেশার প্রতি ভালোবাসার প্রশংসা করেছেন বহু নেটনাগরিক। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ট্রাক চালানো এই তরুণীর জীবনযাত্রা যে বহু মানুষের কাছেই অনুপ্রেরণার, তা তাঁর ভিডিয়োগুলির জনপ্রিয়তা থেকেই স্পষ্ট হয়।

×
  • CTVN