Calcutta Television Network

বারাঙ্গনাদের কণ্ঠ হয়ে নির্বাচনে, ফিরে দেখা নিম্মিবাঈয়ের সেই ঐতিহাসিক লড়াই

বারাঙ্গনাদের কণ্ঠ হয়ে নির্বাচনে, ফিরে দেখা  নিম্মিবাঈয়ের সেই ঐতিহাসিক লড়াই
15 September 2026 05:29:41 pm

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে কবি ভর্তৃহরি তাঁর ‘নীতিশতক’-এ রাজনীতির বহুরূপী চরিত্র বোঝাতে বারাঙ্গনার উদাহরণ ব্যবহার করেছিলেন। কখনও রাজনীতি কঠোর, কখনও কোমল; কখনও সত্যনিষ্ঠ, কখনও মিথ্যাচারে ভরা এক নির্মম কুরুক্ষেত্র। আবার কখনও সেখানে ক্ষমতা ও অর্থের হিসাবই হয়ে ওঠে টিকে থাকার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে বারাঙ্গনাদের সরাসরি অংশগ্রহণের নজির খুব একটা বেশি নেই। স্বাধীনতার পরে ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচন সেই দিক থেকে ব্যতিক্রমী। দিল্লির জি বি রোডের যৌনকর্মী নিম্মিবাঈ তখন চাঁদনি চক কেন্দ্র থেকে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি। নিজের পরিচয় তিনি কখনোই গোপন করেননি। তিনি যৌনকর্মীদের প্রতিনিধি হিসেবেই নির্বাচন লড়তে নেমেছিলেন।

নিম্মিবাঈয়ের নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয় ছিল যৌনকর্মীদের অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি। তিনি চেয়েছিলেন, দেশের এই প্রান্তিক পেশাজীবীদের মানুষ হিসেবে দেখা হোক, প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাঁদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিক। যৌনপেশাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন নিম্মিবাঈ। নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিম্মিবাঈ তাঁর এলাকার এক অসুস্থ তরুণী ও ছোট্ট শিশুর কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর দৃঢ় বক্তব্য ছিল, যাঁদের কাছে আর কোনও খদ্দের আসে না, তাঁদের জীবন কীভাবে চলবে? অসুস্থ মহিলা ও তাঁর সন্তানকে দেখার মতো এই সমাজে কেউ নেই, এই বাস্তবতাই তাঁকে ভোটে দাঁড়াতে একপ্রকার বাধ্য করেছে। তাঁর কাছে নির্বাচন শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই ছিল না, বরং নিজের সম্প্রদায়ের হয়ে কথা বলার একটি অভূতপূর্ব সুযোগ হয়ে ওঠে। বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীও সেই সময় নিম্মিবাঈয়ের প্রার্থি হওয়া নিয়ে কলম ধরেছিলেন। তাঁর মতে, সমাজের প্রচলিত নৈতিকতার চোখে এই প্রার্থী দর্পণ হয়ে উঠতে পারে, হয়ে উঠতে পারে অনেকের অস্বস্তির কারণ। কিন্তু সেই অস্বস্তির আড়ালে যে প্রবল সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে, সেটিই অবশ্য আলোচনায় আনা প্রয়োজন। পরবর্তীকালে যৌনকর্মীদের নিয়ে নানা উদ্ধার অভিযান, পুনর্বাসন এবং সরকারি উদ্যোগের খবর বিভিন্নসময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু তাঁদের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক দাবি কিংবা নাগরিক হিসেবে অবস্থান নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক ভাবে প্রতিনিয়ত হ্রাস পেয়েছে। অথচ নির্বাচনের আঙিনায় তাঁরাও অন্য সবার মতোই ভোটার। কলকাতার সোনাগাছি-সহ বিভিন্ন যৌনপল্লিতে ভোটের সময় রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলি তাঁদের কাছে পৌঁছে যায়। প্রার্থীদের কাছে সেখানকার প্রান্তিক মানুষ বারবার সরকারি স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

সময়ের সঙ্গে ‘পতিতা’ বা ‘বেশ্যা’র বদলে ‘যৌনকর্মী’ শব্দটি ইদানিং বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু শুধু ভাষা বদলালেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না, ভোট দেওয়ার সুযোগ সঠিকভাবে পাচ্ছেন কি না, নাগরিক পরিষেবা মিলছে কি না, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার বিভিন্ন যৌনপল্লিতে ভোটার তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিবিধ সমস্যা রয়েছে। এই প্রসঙ্গ থেকেই ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস ফিরে দেখা যায়। স্বাধীনতার পর নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা প্রথম থেকেই স্পষ্ট ছিল। ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, বাঙালি গণিতজ্ঞ সুকুমার সেন ১৯৫০ সালের মার্চে সেই দায়িত্ব নেন। তিনি একাকী চেষ্টা করলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ওঁরা থেকে গেছেন ব্রাত্যই। সংসদে আলোচনাতেও বিশেষ ওঠে না ওদের কণ্ঠ। অগত্যা যাচ্ছে দিন, আচ্ছে দিন। শারীরিক অসুস্থতা ও রাজনৈতিক উপহাস সহ্য করে কাটছে যুগ। নাগরিক অধিকার লুটোপুটি খায় পথে।

×
  • CTVN