ওড়িশার পাটনাগড় পার্সেল বোমা মামলাটি ভারতের অপরাধের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ঘটনা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘটা এই ঘটনাটি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একটি উপহার মুহূর্তের মধ্যে একটা গোটা পরিবারকে তছনছ করে দেয়। মানুষের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। দীর্ঘ সাত বছর আইনি লড়াইয়ের পর, ২০২৫ সালের মে মাসে আদালত এই মামলার মূল চক্রী পুঞ্জিলাল মেহেরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
ঘটনার সূত্রপাত ওড়িশার বলাঙ্গির জেলার পাটনাগড়ে। ২৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সৌম্য শেখর সাহু এবং রিমা সাহুর ধুমধাম করে বিয়ে হয়। বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, তারিখে তাদের বাড়িতে একটি পার্সেল আসে। পার্সেলটি এসেছে ছত্তিশগড়ের রায়পুর থেকে। নবদম্পতি অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে সেই পার্সেলটি খোলেন। কিন্তু বাক্সটি খোলার সাথে সাথেই এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বাড়ি। পার্সেলের ভিতরে সেটি আসলে ছিল একটি হোম-মেড বোমা। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সৌম্য শেখর এবং তাঁর ৮৫ বছর বয়সী ঠাকুমা জেমামণি সাহুর। গুরুতর আহত ও দগ্ধ হন রিমা।
কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, নেই শত্রুতার কোনো স্পষ্ট খতিয়ান, তদন্তকারীরা বুঝতেই পারছিলেন না কে বা কেন এই নিরীহ নবদম্পতিকে টার্গেট করবে। তদন্তের স্বার্থে ওড়িশা পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে কেসটি তুলে দেওয়া হয়। তদন্তে নতুন মোড় আসে তখন, যখন পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ্য করে একটি রহস্যময় বেনামি চিঠি আসে। চিঠিতে অত্যন্ত মার্জিত ইংরেজিতে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যেন কোনো নিরীহ মানুষকে হেনস্থা না করা হয়। কিন্তু অপরাধতত্ত্বেই আছে, অপরাধী যেখানেই চালাকি করে, সেখানেই কোনো না কোনো ক্লু রেখে যায়। সৌম্য শেখরের মা, যিনি নিজে পেশায় একজন কলেজ শিক্ষিকা ছিলেন, তিনি চিঠির লেখার ধরন এবং কিছু নির্দিষ্ট ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দেখে তাঁর এক সহকর্মীকে সন্দেহ করেন।
সেই চিঠির সূত্র ধরেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে পুঞ্জিলাল মেহেরকে। পুঞ্জিলাল ছিলেন জ্যোতি বিকাশ কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ। তদন্তে উঠে আসে এক ভয়ানক প্রতিশোধের গল্প। পুঞ্জিলালকে সরিয়ে সৌম্য শেখরের মা সংযুক্তা সাহুকে কলেজের অধ্যক্ষের পদে বসানো হয়। এই পদচ্যুতি পুঞ্জিলাল মেনে নিতে পারেননি। তাঁর অহংকারে আঘাত লেগেছিল এবং তিনি ভেতরে ভেতরে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখছিলেন। সহকর্মীকে সরাসরি আঘাত না করে, তাঁর একমাত্র সন্তানকে কেড়ে নিয়ে তাঁকে সারাজীবনের মতো শেষ করে দেওয়ার এক নারকীয় ছক কষেন এই শিক্ষক।
পুঞ্জিলাল মেহের অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই খুনের পরিকল্পনা করেন। পুলিশ জানায়, তিনি ইউটিউব দেখে বোমা তৈরির কৌশল শেখেন। দীপাবলির সময় কেনা বাজি থেকে বারুদ সংগ্রহ করে নিজের হাতে তৈরি করেন সেই পার্সেল বোমা। পুলিশকে ফাঁকি দিতে নিজের মোবাইল ফোনটি বাড়িতেই রেখে ট্রেনে করে রায়পুর যান পার্সেলটি কুরিয়ার করতে, যাতে তাঁর টাওয়ার লোকেশন বাড়িতেই দেখায়। সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে তিনি ট্রেনের টিকিট পর্যন্ত কাটেননি। অপরাধ করার পর তিনি সৌম্য শেখরের বিয়ে এবং এমনকি তাঁর শেষকৃত্যেও যোগ দিয়েছিলেন, যাতে কেউ তাঁকে সন্দেহ না করে।
কিন্তু ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্ত, শেষ অব্দি কেসটিকে ক্র্যাক করে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা এই চাঞ্চল্যকর মামলার ট্রায়াল শেষে, ২০২৫ সালের মে মাসে আদালত পুঞ্জিলাল মেহেরকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ও বিস্ফোরক আইনের ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। দেরিতে হলেও আদালতের এই রায় ভুক্তভোগী পরিবারকে সামান্য হলেও শান্তি এনে দিয়েছে।