অনিন্দ্য বিশ্বাস: দেবী দুর্গা কেবল অসুরদলনী নন, তিনিই মহাবিশ্ব। দেবতারা যখন জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে দেবী! তুমি কে?' দেবী বললেন, 'আমি ব্রহ্মস্বরূপ। আমার থেকেই প্রকৃতি-পুরুষ সৎরূপ ও অসৎরূপ জগৎ উৎপন্ন হয়েছে। শ্রীশ্রীচণ্ডীর শ্রীদেব্যথর্বশীর্ষমের প্রথম শ্লোকেই আছে 'সাব্রবীৎ-অহং ব্রহ্মস্বরূপিণী। মত্ত: প্রকৃতিপুরুষাত্মকং জগৎ। শূন্যং চাশূন্যং চ।। মুণ্ডমালাতন্ত্রে রয়েছে 'ওঁ ভূতানি দুর্গা ভুবনানি দুর্গা স্ত্রীয় পশুশ্চ নরশ্চ দুর্গা। যদ্ যদ্ধি দৃশ্যং খলু তদ্ধি দুর্গা দুর্গা স্বরূপাৎ নৈবাস্তি কিঞ্চিৎ।।' যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, জগতে যা কিছু, এই পঞ্চভূত ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম দ্বারা নির্মিত, সেই সমস্ত জীবই দুর্গা। চতুর্দশ ভুবন বা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে তিনিই বিরাজমান। নারী, পুরুষ কিংবা পশু, সব কিছুতেই দুর্গাতত্ত্ব বর্তমান । সহজ কথায়, আমাদের কাছে যা কিছু দৃশ্যমান এবং জীব বা জড় যা কিছুই আমরা অনুভব করতে পারি, সবেতেই দেবী ভিন্ন আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি সর্বব্যাপী এবং স্বয়ং প্রকৃতিস্বরূপা।
ছবি: এআই
দুর্গোৎসব, সেটা বাসন্তী হোক বা শারদীয়া, এই পূজা কেবলই মূর্তিপূজার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মৃন্ময়ী প্রতিমার অন্তরালে চিন্ময়ী শক্তির যে আরাধনা করা হয়, তা মূলত এই বিশ্বজনীন দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই জন্যই তো কলা সহ নয়টি গাছকে (কলা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান) একত্র করে তৈরি করা হয় নবপত্রিকা। এই নয়টি গাছ দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীক। এই কৃষি প্রধান দেশে, বিশেষ করে পৃথিবীর প্রতিটা উপাদানেই যে দুর্গা তত্ত্ব বর্তমান তারই প্রতীক হিসাবে রয়ে গেছে এই নবপত্রিকা। মহাস্নানের সময় দেবীকে স্নান করাতে বিভিন্ন তেল সহ প্রায় ৩৫ ধরনের সামগ্রী প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো গঙ্গাজল, মহাসমুদ্রের জল, বৃষ্টির জল, সরস্বতী নদীর জল এবং পদ্মরেণু মিশ্রিত জল। শুধু জলই নয়, স্নানের উপচারে লাগে পঞ্চগব্য (গোমূত্র, গোময়, দুগ্ধ, দধি, ঘৃত), পঞ্চ কষায় (জাম, শিমূল, বেড়েলা, বকুল ও টোপাকূলের ছাল), কুশ জল, চন্দন, মধু এবং আখের রস। বিশ্ব চরাচরের সব উপাদন দিয়ে দেবীকে স্নান করানো হয়। এছাড়া, সমাজের সর্বস্তরের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বেশ্যাদ্বারের মাটি, রাজদ্বারের মাটি সহ মোট ১৭ ধরণের মাটি এই স্নানের উপচারে ব্যবহৃত হয়। শ্রীশ্রী দুর্গা কখনো পরমাণুর মত ক্ষুদ্র আবার কখনো পর্বতের মত বিশাল।
দুর্গাতত্ত্ব আমাদের কাছে একটি শিক্ষা। যদি জগতের প্রতিটি মানুষ, নারী এবং পশুপাখির মধ্যে দেবী দুর্গারই অংশ দেখা সম্ভব হয়, তবে কাউকে অবহেলা বা হিংসা করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মান রক্ষা, প্রতিটি জীবের প্রতি করুণা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখাই হয়ে ওঠে প্রকৃত দুর্গাপূজা। তাই দেবী দুর্গা কেবল হিমালয় দুহিতা বা শুধুই দশভূজা প্রতিমা নন, তিনি চরাচরের প্রতিটি স্পন্দনে প্রবহমান মহাশক্তি। দেবীকে বিশ্বরূপে দর্শন করার এই বোধ যদি আমাদের মননে জাগ্রত হয়, তবেই তা হবে প্রকৃত দুর্গাপূজা।