মাঠ ভর্তি কাশফুল, আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ, অপু-দুর্গা ছুটে চলেছে রেলগাড়ির দিকে। কালজয়ী এই বাংলা সিনেমার দৃশ্যটির সাথে আমরা সবাই খুব ভালো ভাবে পরিচিত। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'- দৃশান্তর, সত্যজিৎ রায়কে এনে দিয়েছিল অস্কার। গল্পের প্রতিটি লাইন যেমন মনে রেখে দেওয়ার মত, সিনেমার দৃশ্য গুলোও গেঁথে রয়েছে বাঙালী মননে। এই রচনা বিশ শতকের সমাজের এক চিরন্তন শাশ্বত ছবি, যা এই একবিংশ শতকেও বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রকাশের এক শতাব্দী পরেও নিশ্চিন্দিপুরের অপু, দুর্গা, সর্বজয়া আর হরিহরের গল্প আমাদের নগরকেন্দ্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজকে আত্ম সমালোচনার মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। সময়ে ফারাকে আমাদের জীবনযাত্রার মান হয়ত আমূল বদলে গেছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক আবেগ, জীবন সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সাথে তার আত্মিক সম্পর্কের যে ছবি বিভূতিভূষণ রেখে গেছেন, তার গুরুত্ব বর্তমানে আরও বেশি অনুভূত হয়।
'কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেল গুলো সেই'- প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার চাপে হারিয়ে গেছে শিশুদের সেই শৈশব। সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে মাঠ, জঙ্গল, পুকুর, কাশবন, গ্রাম হোক আর শহর, প্রকৃতি যেন গুটিয়ে ফেলেছে তার সাত রং। নিশ্চিন্দিপুরের সেই বাঁশবাগান, জঙ্গল, পুকুর বা অবারিত কাশবন যেভাবে অপু-দুর্গার শৈশবকে রাঙিয়ে তুলেছিল, আজকের দিনে তা রূপকথা। আধুনিক শহরে বা বর্তমান গ্রামের পরিবেশেও শিশুরা আজ চার দেওয়াল ও ল্যাপটপ-ফোন-ট্যাবলেটের স্ক্রিনে বন্দী। প্রকৃতির বুকে ছুটে বেড়ানোর যে অনাবিল আনন্দ, যে স্বাধীনতা, তা ওই পথের পাঁচালীর দৃশ্যেই রয়ে গেছে। হরিহরের স্বল্প আয় ও তার অনিশ্চয়তার মধ্যেও সংসারকে টিকিয়ে রাখার যে লড়াই সর্বজয়া করে গেছে, তা কিন্তু আজকের নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের রোজের গল্প। বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং পাকাপাকি আশ্রয় খোঁজের যুদ্ধের মধ্যে বার বার ফিরে আসে সর্বজয়ার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। আবার ইন্দিরা ঠাকুরণের একাকিত্ব ও অবহেলা, বর্তমানের ভেঙে যাওয়া যৌথ পরিবার বা বৃদ্ধাশ্রম সংস্কৃতির প্রতিফলন।
তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও দারিদ্রতার মাঝেও 'পথের পাঁচালী' কিন্তু জীবনের আসল সৌন্দর্য আর খুব সহজ আনন্দের রূপরেখা এঁকে দেয়। দূর থেকে ছুটে যাওয়া রেলগাড়ি ও তাকে দেখেও যে রোমাঞ্চ বা আনন্দ হতে পারে, অপু-দুর্গার এই সরলতা আমাদের অল্পতে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার পাঠ দিয়ে যায়। আজকের এই চরম ভোগবাদী সমাজে, যেখানে মানুষ অন্তহীন চাহিদার পেছনে ছুটেও, মানসিক অবসাদ ও হতাশায় ভুগছে, সেখানে বিভূতিভূষণের কলমে সরল জীবনবোধ অনেক শিক্ষা দিয়ে যায়। যেন অপু-দুর্গা এটাই বুঝিয়ে গেছে, জীবনে সুখী হওয়ার জন্য বিপুল বিত্তের প্রয়োজন সবসময় নাও হতে পারে, বরং আশেপাশে খুঁজলে ঠিকই সুখী হওয়ার রসদ খুঁজে পাওয়া যায়। পথের পাঁচালী শুধুই একটা সিনেমা বা উপন্যাস কখনই ছিল না, এই লেখা যেমন একটা সময় সমাজের চিত্রকে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল, তেমনি আজও সমাজের বৈপরীত্যর সাক্ষী হয়ে রয়ে গিয়েছে।