বিনোদনের জন্য টেলিভিশন বা মোবাইলের উপর নির্ভর না করে বইকেই জীবনসঙ্গী করে নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। তাঁদের উদ্যোগে গ্রামের রাস্তা, বাড়ি, বাজারের আশপাশ এমনকি গাছের তলার বাঁধানো চাতালও হয়ে উঠেছে বই পড়ার আসর। কোথাও রাস্তার ধারে রাখা বইয়ের আলমারি, কোথাও আবার বাড়ির একটি ঘরই ছোট গ্রন্থাগার। এ ভাবেই ভারতের নানা রাজ্যে গড়ে উঠেছে একাধিক ‘বইগ্রাম’। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার ছোট পাহাড়ি গ্রাম 'ভিলার' দেশের প্রথম সুপরিচিত বইগ্রামগুলির অন্যতম। মহাবালেশ্বর ও পঞ্চগনীর মধ্যিখানে অবস্থিত এই গ্রাম আগে মূলত স্ট্রবেরি চাষের জন্য পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালে সরকারি উদ্যোগে গ্রামটি বইকে কেন্দ্র করে নতুন ভাবে সাজানো হয়। বর্তমানে এখানে কয়েক হাজার বই রয়েছে। মারাঠি ভাষার পাশাপাশি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার বইও উপলব্ধ। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে বই সাজানো হয়েছে। কোথাও সাহিত্য, কোথাও ইতিহাস বা দর্শন, আবার শিশুদের জন্য রয়েছে গল্প ও কমিকস বই। পথের ধারে বসে বিনামূল্যে বই পড়ার ব্যবস্থাপনাও রয়েছে। বইকে ঘিরে পর্যটনেরও বিকাশ ঘটেছে ভিলারে। দেশের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও অনেকে আসেন এই গ্রামে। কেরলের কোল্লাম জেলার পেরুমকুলমও বইপ্রেমীদের কাছে বিশেষ পরিচিত। গ্রামটির বই পড়ার সংস্কৃতির শুরু বহু বছর পূর্বে। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিতে ১৯৪৮ সালে সেখানে একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছিল। স্থানীয়দের বই দান করার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সেটি বড় হয়ে ওঠে। পরে গোটা গ্রামেই ছড়িয়ে দেওয়া হয় ছোট ছোট বই রাখার কাঠের বাক্স। রাস্তার মোড়, বাসস্টপ এবং গাছের নীচেও দেখা যায় এই ছোট বইঘরগুলি। স্থানীয়দের কাছে এগুলি ‘বুক নেস্ট’ নামে পরিচিত। যে কেউ বই নিয়ে পড়তে পারেন এবং পরে সেটি আবার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যেতে পারেন সযত্নে। উত্তর কাশ্মীরের বান্দীপোরা জেলার অরাগাম গ্রামও সাম্প্রতিক সময়ে বইকে কেন্দ্র করে নতুন পরিচয় পেয়েছে বিশ্বের দরবারে। শিক্ষার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যেই গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ছোট গ্রন্থাগার তৈরি করা হয়েছে। কোথাও পাঠ্যবই ও চাকরির পরীক্ষার বই, আবার কোথাও উপন্যাস, কবিতা কিংবা কোথাও রাখা হয়েছে শিশু সাহিত্যের সম্ভার। ফলে একটি বই পড়তে গিয়ে অন্য বইয়ের খোঁজে গোটা গ্রাম ঘুরে দেখার সুযোগও পান পাঠকেরা। পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে এমন একটি উদ্যোগ।
আলিপুরদুয়ারের জঙ্গলঘেরা পানিঝোড়া গ্রামকে রাজ্যের প্রথম বইগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ অগস্ট থেকে সূচনা হয় এই উদ্যোগের। আদিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং তরুণদের বইমুখী করাই ছিল মূল লক্ষ্য। গ্রামে ‘আলোকবর্তিকা’ নামে একটি বড় গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রায় তিন হাজার বই রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে একাধিক ছোট পাঠাগার। শিশুদের কমিকস ও গল্পের বই থেকে শুরু করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির বইও পাওয়া যায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও রয়েছে বই পড়ার সুযোগ। উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার মণিগূহ গ্রামও বইয়ের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘পুস্তক তীর্থ’ নামে একটি বড় গ্রন্থাগার। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার বইয়ের পাশাপাশি বহু পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বইও সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে। দেশের এই বইগ্রামগুলি প্রমাণ করে, বই পড়ার অভ্যাস আজও হারিয়ে যায়নি। বরং বহু জায়গায় বইকে কেন্দ্র করেই বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন ও গ্রামের পরিবেশ। মোবাইলের চৌকো স্ক্রিনের বাইরে এক ভিন্ন জগতে বই হাতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর সুযোগ তৈরি করছে ভারতের এই অভিনব গ্রামগুলি। বাড়ছে বই, বাড়ছে 'বই'-ঠকি আড্ডা!