Calcutta Television Network

‘দি গ্রেট ব্যানিয়ান ট্রি’, নিজেই একটা ইকোসিস্টেম!

‘দি গ্রেট ব্যানিয়ান ট্রি’, নিজেই একটা ইকোসিস্টেম!
21 September 2026 05:32:59 pm

একটি গাছ যে কীভাবে নিজেই একটি আস্ত অরণ্য হয়ে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শিবপুরের বটবৃক্ষ যার পোশাকি নাম ‘দি গ্রেট ব্যানিয়ান ট্রি’। শিবপুরের আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেনের মূল আকর্ষণ এই শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছটি শুধু ভারতের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের এক প্রাকৃতিক বিস্ময়। গাছটির সঠিক জন্মসময় জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এর বয়স প্রায় ২৭০ বছরেরও বেশি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এর বায়বীয় শিকড় বা বটের ঝুরি মাটিতে নেমে শক্ত কাণ্ডে পরিণত হয়েছে। 


১৭৮৭ সালে যখন বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এই গাছটির উল্লেখ পাওয়া যায়। দেশ-বিদেশের বহু ভ্রমণকাহিনী এবং ইতিহাসে এই বটবৃক্ষের উল্লেখ রয়েছে। যুগ যুগ ধরে এই গাছটি ভারত তথা বাংলার ইতিহাসের বহু উত্থান-পতন, ঝড়-ঝাপটার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই গাছের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটির কোনো মূল কাণ্ড বা গুঁড়ি নেই। ১৮৬৪ এবং ১৮৬৭ সালের দুটি বিধ্বংসী সাইক্লোনে গাছটির মূল কাণ্ডটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে ছত্রাক সংক্রমণের ফলে কাণ্ডে পচন ধরলে গাছটিকে বাঁচাতে ১৯২৫ সালে এর মূল কাণ্ডটি সম্পূর্ণ কেটে বাদ দেওয়া হয়। মজার বিষয় মূল কাণ্ড না থাকলেও গাছটির জীবনীশক্তি বা বৃদ্ধিতে কোনো খামতি আসেনি। ডালপালা থেকে নেমে আসা হাজার হাজার ঝুরি বা স্তম্ভমূল মাটির গভীরে প্রবেশ করে একেকটি নতুন কাণ্ডের রূপ নিয়েছে এবং গাছটিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রেখেছে। 


শিবপুরের এই বটগাছটির বর্তমানে প্রায় ৪.৬৭ একর এলাকা জুড়ে বিস্তার । এর উপরিভাগের পরিধি প্রায় ৪৮৬ মিটার এবং এর সর্বোচ্চ শাখাটি প্রায় ২৪.৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। বর্তমানে গাছটির মাটির সাথে যুক্ত ঝুরির সংখ্যা ৪,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৮৯ সালে এই বিশাল পরিধির কারণে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম গাছের খেতাব দেওয়া হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এটি একটি গাছ নয়, বরং ঘন সবুজ কোনো অরণ্য। গাছটির চারপাশ দিয়ে তৈরি করা ৩৩০ মিটার দীর্ঘ রাস্তাকেও অতিক্রম করে এর শাখা-প্রশাখা অনবরত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। 


পরিবেশগত দিক থেকেও এই বটবৃক্ষটি একটি আস্ত ইকোসিস্টেম। বিশাল এই বটের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে হাজারো রকমের পাখি, কীটপতঙ্গ, বাদুড় এবং কাঠবিড়ালি। এটি শুধু দর্শনীয় তাই নয় বরং দূষিত বাতাসকে পরিশুদ্ধ করতে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই বটগাছটি কেবল একটি গাছ-ই নয়, এটি প্রকৃতির সৃষ্টি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। মানুষের তৈরি বড় বড় অট্টালিকা যেখানে সময়ের নিয়মে ভেঙে পড়ে, সেখানে প্রকৃতির এই জীবন্ত স্থাপত্য বছরের পর বছর ধরে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে চলেছে। প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থী প্রকৃতির এই আশ্চর্য রূপকে প্রত্যক্ষ করতে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে ভিড় জমান।


×
  • CTVN