মাদক তৈরি ও পাচারের অভিযোগে মিশরে এক টেলিভিশন সঞ্চালিকা-সহ ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিল তাদের দেশের আদালত। তাঁদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ কৃত্রিম মাদক তৈরি, সরবরাহ এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে মিশরের সরকারি সংবাদমাধ্যম। এই মামলায় সবচেয়ে বেশি চর্চায় রয়েছেন ৩৯ বছর বয়সি সুন্দরী টিভি উপস্থাপিকা সারা খলিফা। সারা মিশরের একজন পরিচিত মুখ। ‘মিশন ইম্পসিবল’ নামে একটি অনুষ্ঠানে তিনি সঞ্চালকের গুরুদায়িত্ব পালন করতেন। অপরাধ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলত সেই অনুষ্ঠানে। ফলে মাদক মামলায় তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই দেশজুড়ে বিপুল আলোড়ন তৈরি হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সারা এবং তাঁর সহযোগীরা বিদেশ থেকে কৃত্রিম মাদক তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান আনিয়ে নিতেন। পরে সেই উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা হত মাদক। তৈরি হওয়া মাদক বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য চক্রের অন্য সদস্যরা নিয়মিত কাজ করতেন। অর্থাৎ, পুরো ব্যবস্থাটি কয়েকটি নিদৃষ্ট ভাগে বিভক্ত করে চালানো হত বলে তদন্তে সামনে এসেছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ কায়রোতে একটি মাদক মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সারার নাম প্রথমবার সামনে আসে। পরে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়। তদন্ত যত এগোয়, ততই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ওই বছরের শেষদিকে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। তবে আদালতে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন সারা। শুনানির সময় তিনি দাবি করেন, মাদক সম্পর্কে তাঁর নাকি নূন্যতম ধারণাই ছিল না। এমনকি তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের সামনে ছবি তোলার আগে পর্যন্ত তিনি জীবনে মাদক দেখেননি বলেও স্পষ্ট করে বয়ান দেন। তিনি নিজে সিগারেটও কখনও ব্যবহার করেননি বলে বিচারককে স্পষ্ট করেন। আদালতে নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সারা। বিচারকের কাছে বার বার নিজের কথা শোনার আর্জি জানান। তাঁর দাবি, বরাবরই সচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। টাকার অভাব তাঁর কখনোই তেমন ছিল না। তাই মাদক ব্যবসা থেকে অর্থ উপার্জনের কোনও প্রয়োজন তিনি কখনো বোধ করেননি। টেলিভিশনের কাজের পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গেও যোগ ছিল সারার। কসমেটিক সার্জারির একটি ক্লিনিক এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার একটি সংস্থার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। তদন্তে ৭৫০ কেজির বেশি মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিশরের জাতীয় সংবাদমাধ্যম। মাদক তৈরির নানা যন্ত্রপাতিও বাজেয়াপ্ত করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, কায়রোর দু’টি ফ্ল্যাটকে গোপনে মাদক তৈরির ডেরা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখান থেকেই বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। মামলার শুনানিতে শুধু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নয়, বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্যও প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। মোবাইল ফোনের মেসেজ, ছবি এবং ভিডিয়ো থেকে অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া গিয়েছে বলে দাবী সরকারি আইনজীবীদের।
এই মামলায় সারা-সহ আরও ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও ন’জনকে যাবজ্জীবন কারাবাস এবং সাত জনকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার আগে মিশরের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি গ্র্যান্ড মুফতির কাছে প্রেরিত হয়। তাঁর মতামত শোনার পর আদালত চূড়ান্ত ভাবে সাজা বহাল রাখে। রায়ের পরও নিজেকে বারবার নির্দোষ বলে দাবি করেছেন সারা। তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে। মিশরে মাদক পাচারের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নিয়ম নিয়ে অবশ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির লিখিত আপত্তি রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, ২০২৫ সালে মিশরে ৪৯২টি মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয় এবং ২৩ জনের সাজা কার্যকর করা হয়। সংস্থাটির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। তবে ওই বছরের মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে মতপার্থক্য রয়েছে।