হুজুগে বঙ্গজীবন। দরকার শুধু উৎসের, বাকিটুকু সন্ধান সে নিজেই করে নেবে। এহেন বঙ্গজীবন রঙিন হয়ে উঠছে না না পুজোসংখ্যার রঙে। কত রঙ, কত গল্প, বিবিধ প্রচ্ছদ। কিন্তু এর শুরুটা ঠিক কিরকম ছিল? হুজুগটা কে তুলেছিল যে পুজো উপলক্ষ্যেও এমন একটি সংখ্যা করা যায়! তার সরণি খুঁজতে পৌঁছতে হবে শরতে নয়, শীতে। বঙ্গে নয়, বিলেতে। প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে খ্রিস্টের জন্ম। অদ্য বিনিদ্র রজনী উদাযাপিত বড়দিনও কিন্তু এসেছে অনেক পরে। এসেছে নানা প্রথা, রীতি রেওয়াজ সম্বল করে। এসবের শুরু উনিশ শতকের কাছাকাছি। তার আগে পালিত হত ধর্মীয় উৎসব হিসাবে। চার্চ কিংবা গির্জায়। এই ধারার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে ১৮২০-৩০ নাগাদ। ধর্মীয় উৎসব রূপ নেয় সামাজিক অনুষ্ঠানের। যাকে ঘিরে পরবর্তীতে গড়ে ওঠে বিকল্প অর্থনীতিও।
তবে এর সূচনালগ্নেও খানিক ভূমিকা ছিল শিল্পবিপ্লবের। নগরায়নের বর্ধিত ধারা গতি পাচ্ছে ক্রমশঃ, অন্যদিকে গ্রাম্য সামাজিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভাঙন সরিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে নতুন সমাজের অবয়ব। বাড়ছে জনমানসে স্বাক্ষরতার হার। এসবকিছুই অনুঘটক বিলিতি বড়দিনের আধুনিকিকরণের। বিপ্লব এলো ছাপাখানার অক্ষর সেজে। সারা বছর কারখানা কিংবা আরও খানিক বাড়িয়ে বললে আপিসের কর্মীরা অবসর পেতেন না তেমন। ছুটি বলতে এই বড়দিন টু বছর শেষ অবধি উদযাপন। এদিকে বেড়েছে স্বাক্ষরতার হার। সন্ধান হল নতুন বিনোদন মাধ্যমের। ইংরেজ প্রকাশক ও ছাপাখানা কর্মীরা এই সার সত্যটি বুঝতে অক্ষম হননি যে বিপুল পরিবর্তন আনতে চলেছে কালি-কলমের ব্যবসা। অগত্যা লেখকরাও বসলেন নড়েচড়ে। ১৮৪০ নাগাদ বড়দিন উপলক্ষে ভুরিভুরি সংকলন প্রকাশিত হল। তৎকালীন নাম ‘ক্রিস্টমাস অ্যানুয়াল’। অর্থাৎ বড়দিনের বার্ষিকী। যত দিন গেলো বাড়তে লাগলো ‘ক্রিস্টমাস নাম্বার’। বহু কিংবদন্তী সাহিত্যিকরা নিয়ম করে লিখতে শুরু করলেন যীশু পুজো সংখ্যায়। বড়দিন সংখ্যাতেই লিখে পাঠকমহলে পরিচিতি পান কিংবদন্তী চার্লস ডিকেন্স। বড়দিন সংখ্যাই আবার কিছু দেশে বাড়িয়ে তোলে এই উৎসবের বিপুল জনপ্রিয়তা। শোনা যায়, ক্রিস্টমাস ট্রি সাজানোর বিষয়টিও নাকি এই সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে উৎসব হবে, উৎসব নিয়ে সমাজের বিদ্যজ্জন মাতব্বরি করবে না তা কি হয়? অগত্যা সবকিছুই যে অবাধে হয়েছিল এমনটা নয়। মহারানী ভিক্টোরিয়া নাকি এই নতুন রীতি রেওয়াজে কুপিত হন। তাঁর বহু প্রজাও এই ক্রমবর্ধমান উৎসাহকে ভালো চোখে দেখেনি। স্কটল্যান্ডের জনতা ধর্মীয় কারণেই এই হুজুগের থেকে খানিক দূরত্ব বজায় রাখছিলেন। যদিও তাঁদের দ্বিধা ও সংশয়কে উপেক্ষা করেই আধুনিক বড়দিনের ঐতিহ্য বিকল্প পথ নির্মাণ করে এগোতে থাকে দিব্যি। ক্রিস্টমাসে কার্ড দেওয়ার চলটাও তখনই শুরু হয়। আজ বড়দিনের সঙ্গে ক্রিসমাস কার্ড যেন অবিচ্ছেদ্য। প্রিয়জনের হাতে তুলে দেওয়া রঙিন কার্ড আর অফুরান শুভেচ্ছা। তবে এর পিছনেও রয়েছে বেশ মজার ইতিহাস।
গল্পের শুরু ১৮৪০-এ। বিলেতে সেই সময় ডাকব্যবস্থায় এল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। ‘পেনি পোস্ট’। উদ্যোগী সরকারি অফিসার স্যর হেনরি কোলের হাত ধরে চালু হল এই বিশেষ ব্যবস্থা। মাত্র এক পেনির ডাকটিকিট লাগিয়েই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চিঠি পাঠানো সম্ভব। তার আগে চিঠির ডাকমাশুল নির্ভর করত চিঠির ওজন এবং কত দূর যেতে হবে তার উপর। ফলে ডাকযোগে চিঠি পাঠানো ছিল মূলত সচ্ছল মানুষদের বিলাসিতা মাত্র। কিন্তু ‘পেনি পোস্ট’ চালু হওয়ার পরবর্তীতেও কোল সাহেবের মনে হল, সাধারণ মানুষকে আরও উৎসাহিত করা দরকার। তখনই পুরনো বন্ধু, চিত্রশিল্পী জন হর্সলির সঙ্গে শলা করে তাঁর মাথায় এল অভিনব এক বুদ্ধি, চিঠির বদলে যদি পাঠানো যায় ছবি আঁকা একটি সুন্দর কার্ড? ভাবনা থেকেই তৈরি হল প্রথম ক্রিসমাস কার্ড। সময়টাও ছিল আদর্শ। বড়দিনের উৎসব তখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সমাজে জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েছে। ফলে কোল ও হর্সলির কার্ডও পেল অভাবনীয় সাড়া। ১৮৪৩ সালে ছাপা হয়েছিল প্রথম ক্রিসমাস কার্ড। দাম ছিল এক শিলিং, আর ছাপা হয়েছিল প্রায় দু’হাজার খানা। তখন কে জানত, এই সামান্য শুভেচ্ছাবার্তাই একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে থেকে যাবে! অনেকে বইয়ের সাথেও উপহার দিতে শুরু করলেন কার্ড। কালাপানির ঢেউ কিন্তু পেরিয়ে গেছিল বিপুল পথ। পৌঁছে যায় ভারতে। সম্পূর্ণ ভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে হলেও জনপ্রিয়তা বাড়ে উৎসবসংখ্যার ও উপহারের। একটা উৎসব আর শুধু থাকে না ধর্মীয় সংস্কার হয়ে। মুছে দেয় বিভাজন, উৎসব হয়ে ওঠে সব্বার।