ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি জেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,০২৯ মিটার উঁচুতে অবস্থিত রূপকুণ্ড হ্রদ। বরফে ঢাকা হিমালয়ের দুর্গম উপত্যকায় এই ছোট হ্রদটি এক অদ্ভুত রহস্যের কারণে সারা বিশ্বে পরিচিত। একে 'কঙ্কাল হ্রদ' (Skeleton Lake) বলা হয়। বছরের বেশিরভাগ সময় বরফাবৃত থাকলেও, বরফ গললে এই হ্রদের জলে এবং চারপাশে শত শত মানুষের কঙ্কাল ও মাথার খুলি ভেসে উঠতে দেখা যায়। ১৯৪২ সালে, ব্রিটিশ বন বিভাগের এক রেঞ্জার হরি কিষাণ মাধওয়াল প্রথম এই হ্রদের সন্ধান পান। তুষারাবৃত দুর্গম পাহাড়ি পথে যাতায়াতের সময় তিনি হ্রদের জলে প্রচুর মানুষের হাড়গোড় দেখতে পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি গুপ্তচররা এই পথ ব্যবহার করেছিল,প্রথম দিকে এরকম ভাবা হলেও, পরে তদন্তে জানা যায়, কঙ্কালগুলো জাপানি সৈন্যদের নয়, বরং সেগুলো অনেক প্রাচীন। উচ্চতা ও চরম আবহাওয়ার কারণে কঙ্কালগুলো বরফাবৃত ছিল এবং পচে নষ্ট হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে এই কঙ্কালের উৎস নিয়ে নানা জল্পনা ছিল গবেষক মহলে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় এই কঙ্কালের কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে গেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কঙ্কালগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের নয়। এখানে নবম শতাব্দী থেকে শুরু করে ১৯ শতকের বিভিন্ন সময়ের মানুষের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে যে মৃত ব্যক্তিদের সবাই কিন্তু ভারতীয় নন। কারও ডিএনএ মিলেছে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সঙ্গে, আবার কারও ডিএনএ পূর্ব ইউরোপ এবং গ্রিসের (মেডিটেরিয়ান অঞ্চল) মানুষের সঙ্গে মিলেছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়ই ছিলেন, তবে কঙ্কালগুলির মধ্যে কোনো ছোট শিশু বা কোনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা এই দেহাবশেষ কোনো নির্দিষ্ট সৈন্যবাহিনীর-ই সেরকম সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
বিজ্ঞানীদের মতে, হ্রদের পাড়ে এই শত শত মানুষের একসঙ্গে মৃত্যুর কারণ ছিল এক এক সময়ে ঘটে থাকা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বেশিরভাগ কঙ্কালের মাথার খুলি ও হাড়গুলোতে বড় ধরণের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আঘাতগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা উপর থেকে কোনো ভারী বস্তু পড়ার ফলে সৃষ্ট। গবেষকদের ধারণা, তীর্থযাত্রীরা বা কোনও নির্দিষ্ট একটি দল যখন খোলা উপত্যকায় ছিলেন, তখন হঠাৎ করে অত্যন্ত বড় আকারের শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। টেনিস বল বা ক্রিকেট বলের মতো ভারী শিলার আঘাতে মাথা ও ঘাড়ে আঘাত পেয়ে তারা মারা যান। খোলা পাহাড়ে মাথা লুকানোর কোনো জায়গা না থাকায় সবাই একসঙ্গে প্রাণ হারান। তবে বিভিন্ন সময়ের কঙ্কাল হওয়ার জন্যে এই তত্ত্ব ততটা জোরালো হয়না। তাই আজও রূপকুণ্ড হ্রদ তার এই রহস্য নিয়ে থেকে গেছে। হিমালয়ের চরম আবহাওয়া এবং প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার এক মর্মান্তিক সাক্ষী হয়ে আজও পড়ে আছে এই কঙ্কালগুলো।