Calcutta Television Network

'বুঝিয়ে বলা'র দিন শেষ, আপাতত নিদান 'না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাবো'

'বুঝিয়ে বলা'র দিন শেষ, আপাতত নিদান 'না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাবো'

10 September 2026 , 02:03:06 pm

এই যে এক হপ্তা আগে দিব্যি ঘেঁটে গেল পার্বত্যনগরী, ভাসিয়ে নিয়ে গেল ঘরদোর। কত মানুষের ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ চুরি হল কোন অশুভ পক্ষীরাজের ডানায় ভর করে। তারা আর কেউ ফিরে আসবে না, আদিম কালের চাঁদিম হিম মাখা হল না ওদের। বদলে গলাবন্ধ পাঁকে প্রাণটা গেল বেঘোরে। মেঘমুলুকে জ্যোৎস্নারাতে যদি ফের দেখা যায় ওদের কালো ছায়া, ভয় পাবে মানুষ? নাকি ‘ননসেন্স’ বলে উড়িয়ে দেবে ফুৎকারে! যদি হিসেব চায় সব খোওয়া যাওয়া গয়নার, ফেরত চায়, প্রবল অন্ধকারে এগোয় ধীরেধীরে। তেড়ে আসে আর বলে, ‘কেন রে ব্যাটা ইস্টুপিড, ঠেঙিয়ে তোরে করবো টিট্’! ভয় পাবে নশ্বর দেহের আপাতকালীন বাসিন্দারা।

নয়তো আশ্বস্ত করবে নিজেদের, এসব বইয়ের পাতায় হয়। বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। বাস্তবে মৃতদেহ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা চলে। কোভিডের সময় হয়েছিল। গঙ্গাজলে ভেসে আসা দেহ। দুই সরকারের দায় ঠেলাঠেলি। এখন দেহ বদলে গেছে জুতোয়। দেহ পেলেও অবশিষ্ট থাকছে না গয়নাগুলো। মৃত্যু আর অতটাও ভীতিপ্রদর্শক নয়। তাই মারা যায় বিবেক। বিসর্জন যায় ভিন্ন রাজ্য থেকে আসা বাবাদের কাছে। যে বাঙালি এককালে ভয় পেত, উপোস শুনে। কুমড়োপটাস ঝাপসা গলায় ফিসফাস স্বরে নিদান দিত, ‘তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে’! যে জাতি সবার চাইতে ভালো মনে করতো, পাউরুটি আর ঝোলাগুড়। আজ সেই আত্মবিস্মৃত জাতির প্লেট সাজাচ্ছে ভিনদেশি। বাঙালি ভয় পাচ্ছে না নিরামিশের নিদানে। আত্মস্থ করছে ‘বাবা’ কালচার, ভিড় জমাচ্ছে ধর্মসভায়।

কিন্তু যে বাঙালি ছেলে-বুড়ো একদিন পা রেখেছিল এক আশ্চর্য দেশে, যে দেশের নাম—‘আবোল তাবোল’, তা ভুলে গিলতে আসছে হিন্দী আগ্রাসন। কী অদ্ভুত মায়াজগৎ ছিল আমাদের! সেখানে যুক্তির নিয়ম চলে না, অসম্ভবই স্বাভাবিক, আর উদ্ভট কল্পনাই যেন বাস্তবের আর এক নাম। অথচ আজ পুরোটাই অতীত! দেশটির প্রবেশপথটিও কিন্তু কম বিচিত্র নয়। পাতাহীন দু’টি গাছের কাণ্ডের মাথায় সরু একটি ডাল আড়াআড়ি ভাবে আটকানো, দেখলে খানিক ভ্রম লাগে। মনে হয় যেন বিটকেল এক ফটক। চারজন গম্ভীর মানুষ যারপরনাই ব্যস্ত সেই ফটকের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজে। ডানদিকের খুঁটিতে ঝুলছে নোটিশ। শতবর্ষ পেরিয়ে তার অক্ষর কিছুটা ঝাপসা। কিন্তু বক্তব্য স্পষ্ট। এই বইয়ের কারবার আজগুবি, উদ্ভট আর অসম্ভবকে নিয়ে। এটি খেয়ালরসের বই; সেই রস যাঁরা উপভোগ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য এ বই নয়।

আর ফটকের মাথায়? লেখা—‘আবোল তাবোল’। এক ভিন্ন সাম্রাজ্য! ছবির বাঁদিকে ছোট্ট করে আঁকা আদ্যক্ষর ‘SR’। সাল ১৯২৩, তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর। যেন ঠিক সেই দিন থেকেই এই অদ্ভুত দেশের দরজা খোলা রয়েছে আপামর বাঙালির জন্য।

খানিক অসুস্থতা সঙ্গী করেই ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সুকুমার রায়। বইটিকে যাতে এক পূর্ণাঙ্গ জগতের রূপ দেওয়া যায়, সেই ভাবনা থেকেই প্রথম ও শেষ কবিতার নাম ছিল একই। কিন্তু আদতে তারা দু’টি ভিন্ন কবিতা—‘আবোল তাবোল’। শুরুতেই পাঠককে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই দেশে ঢুকলে চেনা পৃথিবীর নিয়মকানুন আপাতত বাতিল। সব কিছুই হবে ‘বেঠিক-বেতাল’। মনের বাঁধন খুলে, খেয়ালের মাদল বাজিয়ে, স্বপ্নের দোলায় চেপে যে এই দেশে প্রবেশ করবে, সে-ই মেতে উঠবে অসম্ভবের ছন্দে—‘তাধিন্‌ ধিন্‌’ তালে। কিন্তু তাই আত্মস্থ করেছে বঙ্গজীবন। সারা ভারতবর্ষ যখন ধর্মের হিংসায় জ্বলছে, বাঙালি বুকে টেনেছে সম্প্রীতির শীতল বাতাস। বাইরের কাছে যা ‘অসম্ভব’, ‘ননসেন্স’ তাই আমাদের নিত্যযাপনের সঙ্গী। তবে বোধহয় এবার ছবিটা বদলালো বাংলা জুড়ে। একদা একসময় শিক্ষাঙ্গন জুড়ে যে ছাত্রছাত্রীদের পদশব্দ মুখরিত হত, আজ ধর্মের নগ্ন নাচ চলছে দিব্যি। বুঝতে পারছে না মানুষ। তবু চেষ্টা চলছে বোঝানোর ইহাতেই ভালো হবে। নয়তো নিদান - ‘না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাবো’। কেউ বিবেকের ছদ্মবেশে এসে বোঝাচ্ছে, ‘মনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই’, তবু পরক্ষনেই চোখ রাঙাচ্ছে। প্রতিশ্রুতির বন্যায় ছিল, ‘আদর করে শিকেয় তুলে’ রাখার কথা, আমরা বুঝিনি। তাই ভালো দিনের ঠিকানা চেয়েও মিলছে না কোথাও। বরং বেশি ঘাঁটালে জবাব আসছে, ‘জ্বালিয়ো নাকো মোরে’ অগত্যা সুকুমার তো চোখ বুঁজেছেন, সেই কবেই! তাই আমরাও এসব নিয়ে অধিক না ভেবে, ‘ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর’ জপ করার কথাই এবেলা লিখে রাখি নোটবইতে, নয়তো আবার কখন এসব ‘আবোল তাবোল’ মাথাচাড়া দেবে!

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN