'আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়'- বাংলা, শুধু একটা ভাষা না, বাংলা একটা গোটা জাতির কাছে আবেগ। এই ভাষা আমাদের দিয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, নজরুল বা সুকান্ত ভট্টাচার্যের মত সাহিত্যিকদের। সবার কলমেই কখনও না কখনও বাংলার রূপ, এই ভাষার মিষ্টতা ফুটে উঠেছে। বাঙালি বড় আবেগি, মাথা দিয়ে ভাবার আগে আবেগ দিয়ে ভাবে। 'কুঁড়ে' তকমা পাওয়া এই জাত, দরকারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিপর্যয়ে আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে সবার আগে। সেই যে গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলে গেছিলেন, 'হোয়াট বেঙ্গল থিংস টুডে, ইন্ডিয়া থিংস টুমরো', কথাটা কিন্তু আজও সত্যি হয়েই থেকে গেছে। একটা সময় রাষ্ট্রের রাজনীতির চালিকা শক্তি ছিল এই বাংলাই। শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিনোদন বা খেলাধূলা, এমন কোথাও নেই যেখানে বাঙালিরা নিজেদের গৌরব ক্ষুন্ন হতে দিয়েছে। খাদ্য-রসনা বিলাসে থাকা এই বাঙালির মাতৃভাষা পৃথিবীর অন্যতম মিষ্টি একটি ভাষা। বাঙালি হিসাবে এ কি আমাদের কাছে কম গৌরবের! আসলে বাংলা ভাষা আর রবিবারের দুপুরে পাতে থাকা মটন কষা, দুটোই কিন্তু এই জাতটার কাছে আবেগ। এই দুটো জিনিস নিয়ে চ্যাংড়ামি চলে কি?
'বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীরধনুক'- ১২৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ হয়েছিল রক্তাক্ত, এই ভাষার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে । জাতপাত, ধর্ম বাদ দিয়ে সবাই ঝাঁপিয়েছিল শুধু এই ভাষাটার জন্য। এই ভাষাটা শুধু কয়েকটা অক্ষরের নয়, ভাষাটা রক্তের, প্রতিবাদের। এত কিছুর পরেও মজার কথা, আজ এই যুগে দঁড়িয়ে অনেক বাঙালির-ই 'বাংলাটা ঠিক আসেনা', আসেনা নাকি আনতে চায় না এটা কিন্তু বলা মুশকিল। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছে কিছু হাফ ইংরেজ-হাফ বাঙালি। এখানে ইংরেজি ভাষার বিরোধিতা করা হচ্ছে না, অবশ্যই কে কোন স্কুলে পড়বে, কোন ভাষা বলবে সেটা একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি কি আমরা একটুখানি সংবেদনশীল হতে পারিনা? ভাষার বিবর্তন খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু 'কুল' সাজার জন্য, বাংলার সাথে ইংরেজি বা হিন্দির মিশেলে একটা অদ্ভুত ভাষা তৈরী করা টা শুধু ভাষাটাকেই অপমান করা হয়না, ক্ষুন্ন হয় একটা জাতের গরিমা। এই ভাষার উপরে আঘাত শুধু হঠাৎ আজই হয়নি, যুগ যুগ ধরে চলেছে এই ভাষার উপরে আক্রমণ। কিন্তু তারপরেও জীবনানন্দ শালিক হয়ে এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছে, এই ভাষার টানেই।
কথায় বলে 'কালিকা বঙ্গদেশে চ', যে বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী স্বয়ং কালিকা, রুধিরপ্রিয়া, বলিপ্রিয়া। এই বাংলার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কোনও স্বঘোষিত 'বাবাজির' জ্ঞান শুধু চ্যাংড়ামিই নয়, এই বাংলাকে অপমানও বটে। '....সামিষঅন্ন নৈবদ্যায় নিবেদয়ামি' মন্ত্রে দেবী দুর্গাকে মাছ, মাংস নিবেদন করা হয়, তারা কি খাবে না খাবে তা কি ঠিক করে দেবে অন্য কেউ? বাংলার লোকেরা প্রধানত নদীমাতৃক, তাই সহজে পাওয়া যায় খাদ্য হিসাবে মাছ বাঙালির প্রিয়। খাদ্য ও খাদকের সম্পর্ক শুধু একটি জাতি নয়, দীর্ঘদিনের অভ্যেস, স্বভাব এবং পরিবেশ ও আবহাওয়া নির্ভর করে থাকে। আর খাদ্যে যদি আধ্যাত্মিকতা আসে, তাহলে এই বাংলা তন্ত্রের। যেখানে দক্ষিণাচারে মায়ের পূজা চলে, তেমনি বামাচারেও পূজা হয়। শক্তি পূজায় বলি কর্তব্য। আর মটন কষা বাঙালির পাতে থাকবে তেরোটা পার্বনেই। এ বাংলা রামকৃষ্ণের, বিবেকানন্দের, রামমোহনের ঠিক ততটাই শ্রী চৈতন্যের। তাই বলা হয়, 'কালী খাবে মাংস, কৃষ্ণ বাজাবে বাঁশি।'
একটি জাতের গরিমা ও আত্মতুষ্টি লুকিয়ে প্রকট হয় তাঁর ভাষা ও খাদ্য দিয়ে। ভাষা যদি মনের ভাব প্রকাশের রাস্তা হয় তাহলে খাদ্য আনন্দ উদযাপনের রসদ। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, দুই-ই এই ভাষা ও তাদের খাদ্যের উপরে অশনি সংকেত নিয়ে এসেছে। যা একটা গোটা জাতিকে তাদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলতে পারে। বাংলা ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখা এবং মাটন কষার ঐতিহ্যবাহী স্বাদকে বাঁচিয়ে রাখা,দুটিই বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই। তাই তো সোজা কথায়, পরিষ্কার ভাষায় জোর গলায় স্পষ্ট বাংলাতে বলে দেওয়া ভালো, "বাংলা ভাষা আর মটন কষা নিয়ে, ভাই কোনও চ্যাংড়ামো নয়।