Calcutta Television Network

'কাঁহা গেলে তোমা পাই'

'কাঁহা গেলে তোমা পাই'

9 September 2026 , 05:31:19 pm

১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুনের পূর্ণিমা, নবদ্বীপে শচীমাতার কোল আলো করে জন্ম নেন নিমাই।  তাঁর জন্ম এই বঙ্গ তথা গোটা দেশে  প্রেমভক্তি, মানবিক ঐক্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নবযুগের সূচনা, যা সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মচিন্তায় গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। আজও তাঁর আবির্ভাব তিথি ‘গৌরপূর্ণিমা’ নামে দেশ-বিদেশে মহাসমারোহে পালিত হয়। কিন্তু এ হেন ধর্মপ্রচারকের শেষটা রয়ে গেছে চরম রহস্যে মোড়া। যা আজও গবেষকদের গবেষণার বিষয় হয়ে রয়ে গেছে। শ্রী চৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্যকে আরও ভালো করে বুঝতে গেলে সমকালীন সাহিত্য, ঐতিহাসিক নথি এবং গবেষকদের দেওয়া নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণগুলির ওপরে আলোকপাত করা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে সমসাময়িক কিছু পদাবলী রচয়িতা, গল্পকারদের নীরবতাও এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।

 

গৌড়ীয় বৈষ্ণবের একাংশের বিশ্বাস, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু পুরীর শ্রীমন্দিরের জগন্নাথ বিগ্রহে বিলীন হয়ে গেছেন। চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে কবি লোচন দাস স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, শ্রী চৈতন্যদেব গুন্ডিচা মন্দিরে কীর্তন করতে করতে হঠাৎ গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন এবং শ্রীঅঙ্গে বিলীন হয়ে যান। এর সাপেক্ষে আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত'-তে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই গ্রন্থে ওনার জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ থাকলেও, শেষের দিকে তার এই চলে যাওয়াকে অন্তর্ধান হিসেবেই দেখানো হয়েছে। আবার কবি জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, "আষাঢ় বঞ্চিত রথ বিজয়া নাচিতে। ইটাল বাজিল বাম পাএ আচম্বিতে॥" অর্থাৎ, আষাঢ় মাসে রথযাত্রার সময় উদ্দাম নৃত্য করার সময় মহাপ্রভুর বাঁ পায়ে একটি ইটের টুকরো বা কাঁটা ফোটে। চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত না থাকায় সেই ক্ষত থেকে রক্তদূষণ (Septicemia) এবং তীব্র জ্বর হয়, এর ফলে তোটা গোপীনাথ মন্দিরে তিনি দেহরক্ষা করেন। কবি কর্ণপূরের 'চৈতন্যচন্দ্রোদয়' নাটক এবং অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, জীবনের শেষ পর্বে মহাপ্রভু হয়েছিলেন দিব্যন্মাদ, যা আধ্যাত্মিক চরম সীমা। প্রায়শই তিনি অচেতন হয়ে যেতেন, সাথে থাকতো শ্বাসকষ্ট। আধুনিক গবেষকদের মতে এটি ছিল কোনও গুরুতর স্নায়বিক রোগ অথবা মৃগীর শেষ পর্যায়। যার কারণে শ্রী চৈতন্যের মৃত্যু হয়।

বিংশ শতাব্দীতে ঐতিহাসিক ডঃ নীহাররঞ্জন রায়, ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায় এবং ওড়িশার গবেষক ভবানীচরণ দাসের গবেষণার পরে শ্রীচৈতন্যের হত্যার তত্ত্বটি অনেকটাই জোরালো দাবি রাখে এবং এর সপক্ষে বেশ কিছু যুক্তিও রাখেন। বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পরপরই তাঁর প্রধান পার্ষদ ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা রহস্যজনকভাবে পুরী ছেড়ে চলে যান অথবা তাঁদেরও আর কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। এমনকি পুরীর মন্দিরে পরবর্তী প্রায় ৫০ বছর নাম-সংকীর্তন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ওড়িশার কিছু স্থানীয় পুথি ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৫৩৩ সালের আষাঢ়ের এক বিকেলে মহাপ্রভু মন্দিরে প্রবেশের পর মন্দিরের মূল সিংহদুয়ার আচমকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ বেশ কয়েক ঘণ্টা পর যখন দরজা খোলা হয়, তখন পান্ডারাজানান যে, শ্রী চৈতন্য জগন্নাথে লীন হয়েছেন। গবেষকদের অনুমান, এই সময়ের মধ্যেই মন্দিরের ভেতরে কট্টরপন্থী ওড়িয়া ব্রাহ্মণদের একাংশ তাঁকে শ্বাসরোধ করে বা আঘাত করে হত্যা করে। কারণ, শ্রীচৈতন্য কর্তৃক নিম্নবর্ণ ও মুসলমানদের বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা দেওয়া, পুরীর রক্ষণশীল সমাজ মেনে নিতে পারছিল না। ওড়িয়া লেখক মাধব পট্টনায়কের ‘বৈষ্ণব লীলামৃত’ গ্রন্থের সূত্র ধরে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, পুরীর রাজার সেনাপতি বা মন্ত্রী গোবিন্দ বিদ্যাধরের নির্দেশে মহাপ্রভুর মৃতদেহ মন্দিরের ভেতরেই ‘কইলি বৈকুণ্ঠ’ (যেখানে জগন্নাথের নবকলেবরের সময় পুরানো বিগ্রহ সমাধিস্থ করা হয়) সেই প্রাঙ্গণে গোপনে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। 


সহজ কথায় বলতে গেলে, শ্রীচৈতন্যদেবের এভাবে অন্তর্ধানের পিছনে যে সত্যি ঘটনাটি ছিল, তৎকালীন ওড়িশার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধের কারণে তাকে পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেই কারণেই আজ ৫০০ বছর পরেও এই ঘটনার কোনো পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যায় না। একদিকে বিজ্ঞান ও ইতিহাস যেখানে মনে করে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে ভক্তরা বিশ্বাস করেন তিনি ভগবানের শরীরের সঙ্গে মিশে গেছেন। যুক্তি আর বিশ্বাসের এই লড়াইয়ের জন্যই তাঁর চলে যাওয়া আজও বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে রয়েছে।    


0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN