If education doesn't teach you to resist injustice it has failed, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, আর শিক্ষা একটা দেশের প্রজন্ম শিক্ষিত না হতে পারলে সেই দেশের উন্নয়ন স্তব্ধ হয়েই যায়। কিন্তু যুগে যুগে এই শিক্ষার উপরেই শাসকেরা আঘাত হেনেছে বার বার। 'ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে', 'হীরক রাজার দেশে' সিনেমায়, হীরক রাজ কবেই বলে গেছিলেন এই কথা। আর যুগে যুগে হয়েও এসেছে তাই। শাসকরা এটা ভালো মতই জানেন প্রজা যদি শিক্ষিত হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে অনেক, হবে রাজার অস্তিত্ব সংকট। তাই একটা গোটা শ্রেণীকে মূর্খ করে রাখাই শ্রেয়, যাতে রাজার গদি কখনো খোয়া না যায়। ভারতবর্ষ, যে দেশে একসময় জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তাকে সমাজ গঠনের ভিত্তি মনে করা হতো, আজ সেখানে যেন পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাকে কোণঠাসা করার এক আগ্রাসী রাজনীতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। জ্ঞানীর যুক্তিকে লাঠি দিয়ে স্তব্ধ করা আর মূর্খের আস্ফালনকে রাজনৈতিক অক্সিজেন দেওয়া, এটাই হয়ে উঠেছে এই শতকে অনিবার্য। শাসকের ক্ষমতা আর সেই ক্ষমতাকে ধরে রাখার লোভ বারবার সমাজকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে।
ভারতের কয়েক দশকের রাজনীতির দিকে তাকালেই কিন্তু দেখা যায়, ক্ষমতার দাপটে সবচেয়ে বেশি আঘাত নেমে এসেছে মুক্তশিক্ষা এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যা একসময় নতুন ধারণার জন্ম দিত, আজ সেগুলোকে রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতা, সর্বত্রই চলছে রাজনৈতিক স্বার্থে কাটছাঁট এবং পরিবর্তনের খেলা। বিজ্ঞানের গবেষণাগারে আজ ঢুকে পড়ছে অপবিজ্ঞান আর কুসংস্কার। আর সেই নিয়ে যখন কোনো ছাত্রসমাজ বা শিক্ষক প্রশ্ন তোলেন, তখনই নেমে আসে 'লাঠি পেটা'র মতো রাষ্ট্রীয় দমন। যৌক্তিক প্রশ্নকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে সমাজের সেই অংশের 'জ্বালা জুড়ানো' হচ্ছে, যারা যুক্তি বোঝে না, শুধু অন্ধ আনুগত্য চেনে।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোও কিন্তু অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। একদিকে সরকারি স্কুল ও কলেজগুলোতে শিক্ষকের অভাব, ভাঙা ক্লাসরুম এবং বরাদ্দ খাতে টাকার অভাব, অন্যদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রমরমা। শিক্ষা আজ অধিকার নয়, বরং চড়া দামে বিক্রি হওয়া এক পণ্য। সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা টাকার অভাবে ভালো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এই বৈষম্য সমাজের এক বিশাল অংশকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও ভারতের একটা বড় অংশকে যখন গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তখন তা আসলে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদের সুবিধাই করে দেয়। কারণ শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক প্রশ্ন করতে জানে, আর মূর্খকে সহজেই চালিত করা যায়।
রাজনীতি যখন মেধার চেয়ে আনুগত্যকে এবং যুক্তির চেয়ে উন্মাদনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন সমাজ ধ্বংস হতে বাধ্য। আজ ডিগ্রি জালিয়াতি, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্যদের শিক্ষকতার আসনে বসানোর মতো ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগ্য প্রার্থীরা যখন রাস্তায় বসে হকের চাকরির জন্য প্রতিবাদ করে, তখন রাজনীতির ঘেরাটোপে ক্ষমতাশীল হয় সেই অযোগ্য আর মেরুদণ্ডহীনরা। এই ব্যবস্থায় তথাকথিত 'মূর্খের জ্বালা' সাময়িকভাবে জুড়াতে পারে, কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার পূরণের হাতিয়ার হতে পারে না। শিক্ষাকে লাঞ্ছিত করে কোনো দেশ সেরা হতে পারে না। ভারতকে যদি সত্যিই আগামীতে এগোতে হয়, তবে রাজনীতির এই ‘লাঠি’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে মুক্ত করতে হবে রাজনীতির কলুষতা থেকে, যাতে মূর্খের আস্ফালন নয়, বরং মেধা এবং মানবিকতার জয় হয়।