যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেন সংস্থিতা।।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
অনুবাদ- যে দেবী সর্বভূতে শক্তিরূপে বিরাজিতা, তাঁহাকে প্রণাম, তাঁহাকে প্রণাম, তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম।
শরতের হিমেল বাতাস, কাশফুলের দোলা আর শিশিরে ভেজা এক মেঠো গন্ধ বয়ে নিয়ে আসে জগৎজননী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। তিনি দশভুজা, বরাভয়প্রদায়িনী, তিনিই নারী শক্তির এক উজ্জ্বল প্রতীক। আসমুদ্র হিমাচল নবরাত্রির এই ন'টা দিন শক্তির উপাসনায় ব্রতী হয়। কিন্তু একদিকে আমরা যখন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মাতৃআরাধনা করছি, অন্যদিকে কোথাও এই দেবী অংশজাত নারী লাঞ্ছিত হচ্ছেন, ধর্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু সেই পৌরাণিক যুগ থেকে বর্তমান, প্রতি মুহূর্তে অশুভশক্তিকে বিনাশের নিমিত্ত জাগরিত হয়েছে নারী শক্তি। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রসুপ্ত শক্তির জাগরণের প্রেরণাদায়ক উদ্যোগটি কিন্তু দেখা যায় শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে।
স নাভিকমলে বিষ্ণোঃ স্থিতো ব্রহ্মা প্রজাপতিঃ।
দৃষ্ট্বা তাবসুরৌ চোগ্রৌ প্রসুপ্তঞ্চ জনার্দনম।। ৪৯।।
তুষ্টাব যোগনিদ্রাং তামেকাগ্রহৃদয়স্থিতঃ।
বিবোধনার্থায় হরের্হরিনেত্রকৃতালয়াম।। ৫০।।
বিশ্বেশ্বরীং জগদ্ধাত্রিং স্থিতি-সংহার-কারিণীম্।
নিদ্রা ভগবতীং বিষ্ণোরতুলাং তেজস প্রভু।। ৫১।।
অনুবাদঃ বিষ্ণুর নাভিকমলে অবস্থিত প্রজাপতি তেজঃপতি ব্রহ্মা অসুরদ্বয় (শুম্ভ-নিশুম্ভ) কে অতি উগ্র এবং জনার্দন বিষ্ণুকে নিদ্রিত দেখিয়া, হরির নিদ্রাভঙ্গের নিমিত্ত- হরিনেত্রকৃতালয়া বিশ্বেশ্বরী জগদ্ধাত্রী স্থিতিসংহারকারিণী ভগবতী অতুলনীয়া বিষ্ণুর নিদ্রারূপিণী সেই যোগনিদ্রার ধ্যান করিতে লাগিলেন।
মধু ও কৈটভ দুই ভয়ঙ্কর অসুর যখন উগ্র হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তখন তিনি শ্রীহরির যোগনিদ্রা ভঙ্গের জন্য বিষ্ণুর নয়নাশ্রিত পরমেশ্বরী, যোগমায়ার স্তুতি করে বলেন- হে দেবী তুমি স্বহা, স্বধা, তুমিই বষট্কার স্বররূপিণী। তুমিই কালরাত্রি, মহারাত্রি, ভীষণ মোহরাত্রি স্বরূপা। এই ভাবেই তেজপতি ব্রহ্মা, তামসী নিদ্রারূপিণী মহামায়াকে তাঁর মহিমার কথা শুনিয়ে জাগ্রত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুও তামসিক নিদ্রা থেকে মুক্ত হলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের পর বধ করলেন দুই পরাক্রমশালী অসুরকে। রক্ষা পেলেন ব্রহ্মা। দেবীর জাগরণের ফলেই অশুভ শক্তির বিনাশ সম্ভব হয়েছে। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে প্রথম চরিতে বর্ণিত নারী শক্তি জাগরণের প্রথম দৃষ্টান্ত। এর পরেও বারবার দেবী জাগরিত হয়েছেন আসুরিক শক্তিকে নাশ করার জন্য।
ছবি সৌজন্যে: শর্মিষ্ঠা দত্ত
দুর্গাপূজা আমাদের কাছে এক বিশেষ উৎসব। এই পূজার উদ্দেশ্য মাতৃশক্তিকে আহ্বান করা, তাঁকে শ্রদ্ধা করা, দেবী অংশজাত নারীকে প্রকৃত সম্মান করা। কিন্তু সেটা আমরা কজনেই বা মনে রাখি? তাই হয়তো কোনো এক নির্ভয়া, আসুরিক শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাই শুধুই আনন্দ-উৎসব দিয়ে দুর্গাপূজা নয়। এই পূজার মধ্য দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে তাঁর মাহাত্ম্য এবং তার দ্বারা যদি নারীজাতির জাগরণ ঘটে, তবে সেটা সমাজ ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক। একজন নারী যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবেই সমাজের প্রত্যেক নারী এগিয়ে আসবে অন্যায়ের প্রতিবাদে। তবে শুধু নারীজাতিই নয়, দেবী দুর্গার পূজা যদি পুরুষজাতিকেও জাগ্রত করে, তবে সেটাই হবে মায়ের পায়ে প্রকৃত অঞ্জলি।
তথ্যঋণ: শ্রীশ্রীচণ্ডী, গীতাপ্রেস