আজ তৃতীয়া, কোমর বাঁধছে বাঙালি। কাল বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতে না হতেই রাস্তায় ঢল নামবে মানুষের। শরতের নীল আকাশ, শিউলির গন্ধ আর ঢাকের আওয়াজ জানান দেয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আগমনী বার্তা। দুর্গাপূজা এসে গেলো যে, চারিদিক শুধু আলো আর উৎসবে মাতোয়ারা। আর উৎসব মানেই খাওয়াদাওয়া, বিশেষ করে দুর্গাপূজার কথা উঠলে, ঠাকুর দেখা, রাত জাগার সাথে সাথে যেটা থাকবেই সেটা রসনাতৃপ্তি। ওটা বাদ দিলে পাতে কিন্তু আর কিছু পড়ে থাকে না। কিন্তু উৎসবের দিনগুলো কি বাড়ির রান্না খেয়ে পেটচুক্তি হয়? নাকি রেস্তোরাঁয় বসে হই হই করে খাওয়াদাওয়ার মজাই আলাদা? দ্বন্দ্ব কিন্তু থেকেই যায়। আর এর উত্তর খুঁজতে দ্বিধাবিভক্ত হয় আপামর বাঙালি।
সপ্তমী টু নবমী, সকালে ঘুম থেকে উঠেই পাড়ার মাংসের দোকানে লম্বা লাইন দেওয়ার একটা আলাদা মজা আছে। বাজার-পাতি শেষে বাড়ি ফিরে স্নান সেরে সোজা অঞ্জলি। তারপরে কিছুক্ষনের আড্ডা। তারপরে দুপুর হলেই গরম ভাতে মাংস খাওয়ার পর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ভরপেট একটা দুপুরের ঘুম। এর চেয়ে বড় সুখ আর কী-ই বা হতে পারে! কোনো কোলাহল নেই, নেই কোনো তাড়াহুড়ো।
ঠিক এর উল্টো দিকেই রয়েছে রেস্তোরাঁর রোমাঞ্চ। পূজার পাঁচদিন বাড়িতে বসে খাওয়াটা অনেকের কাছেই বড্ড একঘেয়ে মনে হয়। তাই নতুন জামা গায়ে চাপিয়ে, বন্ধু বা পরিবারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়া কোনো ধাবা বা রেস্তোরাঁর উদ্দেশ্যে। গোলমালের শুরু হয় সেখানে পৌঁছানো মাত্রই। চাতক পাখির মত অপেক্ষারত মানুষের বিশাল সমুদ্র! দরজার বাইরে তখন ডিসপ্লে বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ওয়েটিং নম্বর। নিন, অপেক্ষা করুন। রোদের মধ্যে ঘেমে-নেয়ে, পায়ে ব্যথা নিয়ে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন অবশেষে টেবিল পাওয়া যায়, তখন মনে হয় যেন কোনো যুদ্ধ শেষ হল। এরপর টেবিলে ধোঁয়া ওঠা মাটন বিরিয়ানি, চাপ বা কষা মাংস আসে, তখন প্রথম কামড়েই সব ক্লান্তি নিমেষের মধ্যে কর্পূরের মতো উড়ে যায়। দীর্ঘ এই প্রতীক্ষার পর পছন্দের খাবার মুখে তোলার যেমন আনন্দও আছে, তার স্বাদও কিন্তু হয়ে যায় দ্বিগুন।
তাহলে শেষ পর্যন্ত জয় কার? যদি আপনি বন্ধু বা পরিবার বা প্রিয়জনের সাথে হুল্লোড় আর পুজোর আমেজকে রেস্তোরাঁর প্লেটে বন্দি করতে চান, তবে ৩ ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাটা আপনার কাছে সার্থক। আর যদি আপনি ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে, পরিবারের সাথে শান্তিতে, আয়েশ করে পেটচুক্তি পছন্দ করেন, তবে মায়ের হাতের বা নিজের রাঁধা খাসির মাংসের কোনো বিকল্প নেই। দুর্গোৎসব শুধু খাওয়াদাওয়াই নয়, আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে উদযাপনে। লম্বা লাইন রেস্তোরাঁর হোক বা মাংসের দোকানের, বাঙালির তৃপ্তি থেকে যায় উৎসবের চেনা উদযাপনটুকুর মধ্যেই।