অনিন্দ্য বিশ্বাস: অফিস থেকে বাড়ি ফেরতা অরিন্দমের আজ ঝামেলা হয়ে গেল অটোড্রাইভারের সাথে। খুচরো নিয়ে শুরু, তারপর দু চার কথায়, খিস্তি-খেউড়, গালাগালি। যা দিনকাল তাতে কারোর মুখেই ট্যাক্স নেই, দুজনেরই মুখ চলল সমানে। শেষে খিস্তির স্টক ফুরিয়ে যেতে, হাতাহাতি হওয়ার আগে অরিন্দম বেরিয়ে যায় ওখান থেকে। সারাদিন অফিসে খাটাখাটনির পরে এই ঝামেলা-খিস্তি কারোর ভালো লাগে? কিন্তু না দিয়েও উপায় নেই, মনের ওই তাৎক্ষণিক আরাম তো খিস্তিই দেয়। বাংলা ভাষায় এই খিস্তি কিন্তু আজকের নয়। ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসকে উল্টেপাল্টে দেখলে, খিস্তির উৎপত্তি অনেকটাই প্রাচীন, আজকের গালাগালি তার বিবর্তন মাত্র। যদিও অনেকে এটাকে ভাষা বিকৃতি বলে থাকে, তবে ইতিহাস ঘাটলে খিস্তি বা খেউড়ের পরিবার কিন্তু যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত। যদিও আজ এই ডিজিটাল দুনিয়ায় খিস্তি বা খেউড় সব কালচারে পরিনত হয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটাই এক সময় ছিল 'খেউড় সাহিত্য', যার সাথে জড়িয়ে আছে, হরু ঠাকুর (১৭৪৯–১৮২৪), নিতাই বৈরাগী (১৭৫১–১৮২১), রাম বসু (১৭৮৬–১৮২৮), ভোলা ময়রা ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিদের মত কবিয়ালের নাম।
বাংলা খিস্তির আদি উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে চর্যাপদ বা মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে। সে সময়ে এক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সমাজের রাগ, ক্ষোভ প্রকাশ হত খুব সরাসরি। আর তাই এই কাব্যের লাইনে লাইনে ফুটে উঠতো কটাক্ষ, তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারী শরীর বা যৌনতাকে টেনে আনা হত, যা আজও প্রায় অপরিবর্তিত। এর পর উনিশ শতকে, কবিগানের আমদানি হয় বাংলা সাহিত্যে। পরিবর্তন খুব বেশি নয়, শুধু খিস্তি হত সুরেলা। 'ব্যাটেলতলার' সাহিত্য তখন বাবু কলকাতা কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মত কবিও, ব্যাঙ্গ কবিতায় এমন সব শব্দের ব্যবহার করতেন, কান লাল করার জন্য তা যথেষ্ট। ইংরেজ আমলে বাবুদের 'ছেনালি' নিয়ে এক শ্রেণীর যে ক্ষোভ ছিল, সেই সব ভাষার জন্মই হয়েছিল ক্ষমতার বিরুদ্ধে শোষিতের ভাষা হয়ে।
(দৃশ্যটি উত্তমকুমার অভিনীত এন্টনি ফিরিঙ্গি সিনেমার )
এবার সোজা আলোচনায় আসি খেউড় সাহিত্যের। ভাষাবিদদের মতে 'খেউড়' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ক্ষেড়া থেকে, যার মানে দাঁড়ায় অশ্লীল গ্রাম্য গান বা তীব্র শব্দে গালাগালি। এই ধারার আদি লিখিত রূপ প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায় মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যে। রাজসভার কবি ভারতচন্দ্র কাব্যের খাতিরে যে মার্জিত শৃঙ্গাররস সৃষ্টি করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে কলকাতার বাবুসমাজ ও কবিওয়ালদের আসরে তা অত্যন্ত চটুল রূপ ধারণ করে। টপ্পার সুরে এই খেড়ু সেই সময়ে নদীয়াতে বিখ্যাত ছিল বহুল। পরে কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণ দেব, এই গানের খুব উৎসাহ দিতেন বলতে গেলে উনিই ছিলেন স্পনসর। নবকৃষ্ণ দেবের সভাসদ, কুলুইচন্দ্র সেন রাগ-রাগিনী আর বেশ কিছু বাজনার সাহায্য নিয়ে এই খেউড় গানকে শুদ্ধ করে তোলেন। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেন কুলুইচন্দ্র সেনের খুবই আত্মীয় রামনিধি গুপ্ত ( ১১৪৮-১২৪৫, বাংলা সন)। যাকে আমরা নিধুবাবু বলেই জানি। নিধুবাবুর টপ্পা আজও বিখ্যাত এবং পরে একে আরও বিখ্যাত করে তোলেন গায়ক রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ও চণ্ডিদাস মাল।
মোটামুটি ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যবর্তী সময় কবিয়ালদের এই খেউড়ের বিকাশ হয়। চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলীর একঘেয়ে ধারা থেকে তখন বেরিয়ে আসতে চাইছে বাংলা সাহিত্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পরবর্তী একশতাব্দী এই কবিগান কলকাতা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে সাহিত্যের অন্যান্য ধারাগুলির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। কবি গানের কথা আসলেই উঠে আসে কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গির নাম। একবার কবিগানের আসরে প্রতিপক্ষ কবি ঠাকুরদাস সিংহ, কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির ধর্ম তুলে তীব্র আক্রমণ করে একটি খেউড় বাঁধেন-"আঁস্তাকুড়ের পাতা তুমি, ঘরের চালের খড়, খিরিষ্টিয়ান অ্যান্টনি সাহেব, তুমি তো এক যমজ যম্বর!" এর জবাবে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি যে উত্তর বা ‘উতর’ দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ক্লাসিক উদাহরণ, "খ্রিষ্টে আর কৃষ্টে কিছু ভেদ নাই রে ভাই,শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে, এও তো জানা চাই। আমার খোদা যে, হিন্দুর হরি সে, ওই তো এক ব্রহ্ম বৈ আর নাই।" বাগবাজারের মিষ্টি বিক্রেতা ও প্রখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা খেউড়ের আসরে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। একবার এক মেয়ে কবিয়াল যজ্ঞী ধোপানি, ভোলা ময়রাকে তাঁর পেশা নিয়ে আক্রমণ করলে, ভোলা ময়রা ধোপানিদের পেশা এবং শরীর নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়ে চরম খেউড় আক্রমণ শানিয়েছিলেন, "চিঁড়ে মুড়কি এক দর, সন্দেশেতে মাটি, যজ্ঞী ধোপা মাগীকে ধরে কাপড় কাচায়া কাটি।"
বাংলার এই বিখ্যাত তরজা, খেউর, টপ্পা আজকাল একেবারেই অবলুপ্তির পথে।। তবে একটা সময়ে এটাই ছিল মূলত ‘ভদ্রলোক’ বনাম ‘ছোটলোক’ সংঘাতের ফসল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত নব্য উচ্চবিত্ত সমাজ যখন গ্রামীণ ও কলকাতার নিম্নবর্গের মুখের ভাষাকে ‘ছোটলোকের ভাষা’ বলে দাগিয়ে দেয়, তখন নিম্নবর্গের মানুষেরা এই আক্রমণাত্মক ‘খেউড়’কে হাতিয়ার করে তথাকথিত মার্জিত সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছে। এই সব গানের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছিল সমসাময়িক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন বাংলা নবজাগরণ পূর্ণ রূপ নেয়, তখন বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে বাংলা ভাষার মার্জিতকরণ শুরু হয়। ভদ্রসমাজ, থিয়েটার, যাত্রার দিকে ঝুঁকে যায় এবং খেউড়ের আসরকে ‘নোংরামি’ বলে সমাজ থেকে কার্যত নির্বাসিত করে। আর আমরাও আস্তে আস্তে ভুলে যেতে শুরু করি সেই সব কবিয়ালদের, যারা একসময় শুধু গান দিয়ে নয়, জোরালো খিস্তিকেই প্রতিবাদের হাতিয়ার করে নিয়েছিলেন।
• তথ্যঋণ:- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- সুকুমার সেন।
• উইকিপিডিয়া ও জাদুকর জার্নাল