Calcutta Television Network

অন্ধকার গলি থেকে আলোর জীবন, নতুন করে বাঁচার আশা দেখছে গুজরাটের ভাদিয়া!

অন্ধকার গলি থেকে আলোর জীবন, নতুন করে বাঁচার আশা দেখছে গুজরাটের ভাদিয়া!
22 September 2026 05:11:16 pm

গুজরাট রাজ্যের উত্তর প্রান্ত, রাজস্থান সীমান্তের কাছে বানাসকাঁঠা জেলার থারাড এলাকায় অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম ভাদিয়া। আহমেদাবাদ থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটি বাইরে থেকে ভারতের আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতোই। কিন্তু ভাদিয়ার গ্রাম্য পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকার এবং দীর্ঘদিনের এক নির্মম সামাজিক ব্যাধি। দশকের পর দশক ধরে এই গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে 'পতিতাদের গ্রাম' হিসেবে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় এখানকার নারী ও শিশুদের জীবন এক কুপ্রথার বেড়াজালে বন্দি। 

ভাদিয়া গ্রামের মূল বাসিন্দা মূলত যাযাবর 'সারানিয়া' সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা মোঘল আমলে রাজস্থান থেকে গুজরাটে চলে এসেছিল। একসময় জীবিকার তাগিদেই এই সম্প্রদায়ের মহিলারা নাচ-গানের মাধ্যমে বিনোদন দিয়ে আসতেন, যা কালক্রমে বাধ্যতামূলত দেহব্যবসায় রূপ নেয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ৭৫০ জন মানুষের বাস করা এই ভাদিয়া গ্রামে, দেহ ব্যবসা  কোনো গোপনীয় বা অপরাধ নয়, বরং সামাজিকভাবে স্বীকৃত এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ভয়ঙ্কর বহিঃপ্রকাশ। বংশপরম্পরায় এখানকার পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই ঘরের মেয়েদের খদ্দের জুটিয়ে দেওয়ার দালালি করে আসছেন। ১২ থেকে ১৫ বছরের নাবালিকা মেয়েদেরও এখানে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া হতো এই পেশায়। পুরুষদের উপার্জন বলতে কিছুই ছিল না, তারা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন পরিবারের নারীদের এই আয়ের উপরেই । নিকটবর্তী পালনপুর-থারাড হাইওয়ের ট্রাক চালক থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের পুরুষদের আনাগোনা ছিল এই গ্রামে।

 

বর্তমানে গোটা বিশ্ব যখন নারী স্বাধীনতা ও তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার, ভারতের এই ছোট্ট গ্রাম ভাদিয়া তখন বেরিয়ে আসতে চাইছে মধ্যযুগীয় এই বর্বরতা থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামের তরুণী ও কিশোরীরা এই নারকীয় প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় ২০১২ সালে এই গ্রামে একটি ঐতিহাসিক গণবিবাহ ও বাগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা এই গ্রামের গায়ে লেগে থাকা কলঙ্ক মোচনের প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল। সমাজকর্মীদের লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে এই দেহব্যবসার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা।

তবে এই ব্যবস্থা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ভারতে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। আর দেহব্যবসা এড়ানোর জন্য এক প্রকার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাল্যবিবাহ, যা আইনি ও সামাজিকভাবে কতটা ঠিক সেই প্রশ্ন রেখেই যায়। তবে শত অন্ধকারের মধ্যেও ভাদিয়া গ্রামে এখন পরিবর্তনের মৃদু হাওয়া বইছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো দেখতে শুরু করেছে। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন শিশুরা পড়াশোনা করছে এবং অনেকেই গ্রামের বাইরে নতুন শহরে গিয়ে, সেখানকার হস্টেলে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ছোটখাটো ব্যবসা ও ঋণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। 

ভাদিয়ার এই গল্প কেবল একটি ছোট্ট জনপদের গল্প নয়, এটি দারিদ্র্য, শতাব্দী প্রাচীন কুপ্রথা, নারী অধিকার লঙ্ঘন এবং অন্ধকারের বুক চিরে আলোর সন্ধানে নামা এক জনপদের লড়াই। ভাদিয়ার নারীরা এখন আর অন্ধকার গলির পণ্য হতে চান না, তারা চান সম্মানের সাথে এক স্বাভাবিক জীবন বেছে নিতে।

×
  • CTVN