প্রযুক্তি যত উন্নতি হচ্ছে যোগাযোগ আরও চলে আসছে হাতের মুঠোয়। যুগ বদলাচ্ছে আর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সমীকরণ। পুরোনো যুগের মানুষরা বেশ পিছিয়ে পড়েছে এইসব ব্যাপারে। জেন-জি আর জেন-আলফার যুগে সম্পর্ক বদলাচ্ছে ফটাফট। এক ভালোবাসার সম্পর্কের হাজার নাম, তার হাজার রকমের ক্রাইটেরিয়া। আর জেন-জি ভার্সন ভালোবাসায় নতুন এক নাম এলো এবার, মেবিলেশনশিপ।
মেবিলেশনশিপ (Mebilation-ship), যেখানে দুটো মানুষ সম্পর্কে থাকলেও, কোনো ধরনের কমিটমেন্ট নিতে রাজি থাকেন না। সহজ কথায়, এটি এমন এক সম্পর্ক যেখানে ‘আমরা’ নয়, বরং শুধুই ‘আমি’ বা আমার নিজের সুবিধাই শেষ কথা। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রায়, যেখানে মানুষের নিজস্ব ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মানসিক শান্তিই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার, সেখানে সম্পর্কের ধারণাও বদলে যাচ্ছে। আগে ডেটিং করার মূল উদ্দেশ্য থাকত একটি স্থায়ী সম্পর্কে জড়ানো বা বিয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু মেবিলেশনশিপের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যটা ভিন্ন। এখানে দুটো মানুষ একে অপরের সাথে সময় কাটান, গল্প করেন, ঘুরতে যান এবং শারীরিক ও মানসিক টান অনুভব করেন, কিন্তু যখনই ভবিষ্যতের কথা আসে বা সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে, তখনই একজন বা দুটো মানুষই পিছিয়ে আসে ওই সম্পর্ক থেকে।
মেবিলেশনশিপ কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে?
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ মনে করে, স্থায়ী সম্পর্কে জড়ালে তাদের ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় আপস করতে হবে। মেবিলেশনশিপ তাদের সেই স্বাধীনতা বজায় রেখেই সম্পর্কের একাকীত্ব দূর করার সুযোগ দেয়।
দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা: যেকোনো স্থায়ী সম্পর্কে ভালো সময়ের পাশাপাশি কঠিন পরিস্থিতিও আসে। মেবিলেশনশিপে কোনো দায়বদ্ধতা না থাকায় জটিলতা তৈরি হলেই সহজে সরে আসা যায়।
বিকল্পের আধিক্য: অনলাইন ডেটিং অ্যাপের যুগে মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সঙ্গী খোঁজার সুযোগ থাকছে। ফলে একজনের সাথে চিরকাল আটকে থাকার চেয়ে অনেকে সাময়িক সম্পর্কে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
বাইরে থেকে মেবিলেশনশিপকে যতই আকর্ষণীয় অথবা চাপমুক্ত মনে হোক না কেন, কিন্তু এই সম্পর্ক তৈরি করতে পারে ভয়ঙ্কর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। মানুষের স্বভাবজাত ভাবেই আবেগী, সো কল্ড কুল হলেও কারো ওপর নির্ভর করা এবং কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসা মানুষের স্বভাব। কিন্তু এই সম্পর্কে সচেতন ভাবেই সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, যাতে খুব বেশি মায়া তৈরি না হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সম্পর্কে থাকা দুজনের একজন সত্যিই গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেন এবং অন্যজন আগের মতোই উদাসীন থাকেন। একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় 'অ্যাসিম্যাট্রিক রিলেশনশিপ' বা অসম সম্পর্ক বলা যায়। এর ফলে এক পক্ষ তীব্র মানসিক কষ্ট, অবহেলা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব বা ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে শুরু করেন। অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী মেবিলেশনশিপ মানুষকে ভেতর থেকে নিঃসঙ্গ করে তোলে, কারণ এখানে সাময়িক আনন্দ থাকলেও কোনো গভীর আত্মিক সংযোগ থাকে না।
মেবিলেশনশিপ আদতে একটি সাময়িক স্বস্তি বা ভেবে নেওয়া যায় এটি একটি ট্রেন্ড মাত্র। মানুষ যখন নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনের অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকে, তখন কিছু সময়ের জন্য এটি হয়তো কার্যকরী মনে হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনের জন্য প্রত্যেকেরই একজন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়, যে শুধু সুসময়েই পাশে থাকবে না, বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও হাতটা শক্ত করে ধরে রাখবে। তাই মেবিলেশনশিপে জড়ানোর আগে নিজের আবেগ ও মানসিকতার মূল্যায়ন করা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, আমি কি সত্যিই শুধু সাময়িক আনন্দ চাই, নাকি দিনশেষে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী আশ্রয়ের খোঁজ করছি? উত্তর যদি পরেরটি হয়, তবে মেবিলেশনশিপের এই মায়াজাল থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।