হাতে ছিল বিপুল অর্থ। আমেরিকার শেয়ার বাজারে ছিল বিপুল বিনিয়োগ। রেলপথ থেকে সরকারি বন্ড, জমি থেকে বন্ধকী সম্পত্তি, এমন নানান ক্ষেত্রেই টাকা খাটিয়েছিলেন তিনি। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সেই সম্পদের চাকচিক্য ছিটেফোঁটাও দেখা যেত না। সাধারণ পোশাক, অতীব কম খরচে থাকা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বহু বছর ব্যবহার করা, এই ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধরন। সেই কারণেই আমেরিকার আর্থিক ইতিহাসে হেটি গ্রিনের নাম একদিকে যেমন সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, অন্য দিকে তেমনই জড়িয়ে আছে অসংখ্য কৃপণতার গল্প। ইতিহাসে তিনি পরিচিত ‘ওয়াল স্ট্রিটের রানি’ নামে। ১৯১৬ সালে তাঁর মৃত্যুর সময়কালে সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিপুল। সেই সময়ের হিসাবকে বর্তমান মূল্যে যদি ধরা হয় তা প্রায় ৮৪৩ কোটি টাকার অধিক বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। ফলে অর্থের অভাব তাঁর জীবনে ছিল না কখনই। বরং তৎকালীন সময়ে আমেরিকার অন্যতম ধনী মহিলাই ছিলেন তিনি। কিন্তু সম্পদ থাকা এবং তা সঠিকভাবে খরচ করা, এই দুটি বিষয়কে হেটি যেন সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখতেন। ১৮৩৫ সাল। আমেরিকায় এক বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম হেটির। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে ছোটবেলা থেকেই অর্থ ও ব্যবসার জগতের সঙ্গে তাঁর আত্মিক পরিচয়। বাবা এবং দাদুর কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন বিনিয়োগের প্রাথমিক কৌশল। অর্থ কোথায় রাখলে তা নিরাপদ থাকবে, কোথায় বিনিয়োগ করলে লাভ হতে পারে ভবিষ্যতে, এই হিসাব কষার অভ্যাস তাঁর কৈশোরেই তৈরি হয়েছিল। বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ৬৩ কোটি টাকার সম্পদ পেয়েছিলেন হেটি। মাত্র ২১ বছর বয়সে সেই অর্থ নিয়ে নিউ ইয়র্কে গিয়ে বিনিয়োগ শুরু করেন তিনি। সেই সময় ওয়াল স্ট্রিট ছিল মূলত পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আর্থিক জগতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সেখানে একজন তরুণী হিসেবে নিজস্ব জায়গা তৈরি করা একেবারেই সহজ ছিল না। কিন্তু হেটি ধীরে ধীরে নিজের বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর উপার্জনের পরিমাণও ছিল বিপুল। এক সময় তাঁর আয় ঘণ্টায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়। হেটির বিনিয়োগের পরিধিও ছিল অগাধ। আমেরিকার বিভিন্ন রেল সংস্থায় তাঁর অংশীদারিত্ব ছিল। সেই সময় রেলপথ ছিল দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে এই খাতে বিনিয়োগ তাঁকে শুধু আর্থিকভাবে লাভবানই করেনি, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে প্রভাব তৈরি করেছিল। শুধু রেলপথ নয়, বিভিন্ন সংস্থার শেয়ার এবং সরকারি বন্ডেও অর্থ রাখতেন তিনি। পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনের সময়ে অর্থ ধার দেওয়ার জন্য তৈরি করেছিলেন বড় তহবিল। জমি ও বাড়ির মতো সম্পত্তিতেও টাকা খাটাতেন। অর্থাৎ হেটির সম্পদ কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থ ছিল না। বিনিয়োগের মাধ্যমে সেই সম্পদকে আরও বৃদ্ধি করতেন তিনি। ঝুঁকি কম রেখে দীর্ঘমেয়াদি লাভের দিকে নজর দেওয়াই তাঁর আর্থিক কৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।
হেটি গ্রিনের জীবনকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে এখানেই থাকা বড় বৈপরীত্য। যে মহিলা কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক, তিনি নিজের জীবনযাপন ছিল সম্পূর্ণ বিলাসবহুল বিমুখ। নিউ ইয়র্কে নিজের বাড়ি না ক্রয় করে ভাড়ার বাসস্থানে বসবাস করতেন। এর পেছনে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাড়ির মালিক হলে যে অতিরিক্ত কর ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়, তা এড়াতে তিনি কম খরচের বাসস্থান বেছে নিতেন। এমনকি কর সংক্রান্ত দায় কম রাখার জন্য মাঝেমধ্যেই জায়গা বদল করতেন বলেও নানা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পোশাকের ক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ ছিল একই রকম। পুরনো পোশাক নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করে যেতেন। তাঁর অন্তর্বাস নিয়েও একটি বহুল প্রচলিত গল্প শোনা যায়। কৈশোরে কেনা একটি অন্তর্বাস নাকি বার বার মেরামত করে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন তিনি। তাঁর পোশাকের মধ্যে একটি কালো পোশাকও দীর্ঘসময় ব্যবহারের কথা শোনা যায়। এসব গল্পই ধীরে ধীরে তাঁকে কৃপণতার প্রতিমূর্তি করে তোলে।
ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন হিসেবি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিশ্বাসী। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে মূলধন ধরে রাখা তাঁর বিনিয়োগের কৌশলের অংশও হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনা সেই ব্যাখ্যাকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ নিজের প্রয়োজনেও অর্থ খরচ করতে অনীহা দেখানোর যে সব গল্প তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত হয়েছে, সেগুলি তাঁকে শুধুমাত্র মিতব্যয়ী বিনিয়োগকারী হিসেবে ইতিহাসে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেয় না। বরং অর্থ সঞ্চয়ের প্রবণতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও খানিক গভীর ছিল। হেটির কৃপণতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তাঁর পুত্র এডওয়ার্ডকে ঘিরে একটি ঘটনার কারণে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ছেলের পায়ে গুরুতর চোট লাগে, তারপর চিকিৎসার জন্য অর্থ খরচ করতে চাননি হেটি। তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসার রাস্তা খুঁজছিলেন। চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ছেলের একটি পা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। তবে এই ঘটনাটির বিবরণ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে নানা বিতর্ক রয়েছে। ফলে এটিকে নিশ্চিত তথ্যের বদলে হেটি গ্রিনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বহুল প্রচারিত কাহিনি হিসেবেও দেখা যায়। অর্থনৈতিক ভাবে সফল হওয়ার পরও জীবনযাপনের ধরন কখনোই বদলাননি হেটি। জীবনের শেষ দিকে নিউ জার্সির হোবোকেনে তুলনামূলক ছোট একটি আবাসনে থাকতেন। আড়ম্বর বিমুখ জীবন। ১৯১৬ সালে ৮১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ হয়। হেটি গ্রিনের জীবন উনিশ ও বিশ শতকের গোড়ার আমেরিকার আর্থিক ব্যবস্থায় একজন মহিলার উত্থানের গল্প বলে। একদিকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন কী ভাবে টাকা বিনিয়োগ করে সম্পদ বৃদ্ধি হয়, অন্যদিকে নিজের জীবনে সেই অর্থ খরচ করার ক্ষেত্রে ছিলেন সংযমী। সেই বিরোধাভাসই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যান্য ধনী ব্যক্তিদের থেকে ভিন্ন আখ্যা দেয়।