ভারতে সমকামিতা-র শুরুটা কিন্তু ঔপনিবেশিক বা পশ্চিমা সংস্কৃতির হাত ধরে আসেনি, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সমকামিতার সঙ্গে এ দেশের সমাজ সংস্কৃতির সম্পর্ক অনেক কালের পুরানো। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ এবং মোগল সাম্রাজ্য পর্যন্ত ভারতের সাহিত্য, শিল্প ও সমাজব্যবস্থায় সমলিঙ্গের প্রেম ও যৌনতার বহুবিধ প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬১ সালে ‘সেকশন ৩৭৭’ প্রবর্তনের আগে পর্যন্ত এ দেশে যৌনতার সংজ্ঞা বোধহয় অনেক বেশি সরল ছিল, যদিও কালে কালে "নিষিদ্ধ বিষয়"-এর উপরে নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির খাড়া নেমে এসেছে। তবুও কিছু পুরাণ আর মহাকাব্য প্রমাণ দেয়, সেই সময়কার সমাজ বর্তমান সময়ের থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা রাখত।
প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত এবং বিভিন্ন পুরাণে Gender Fluidity এবং সমপ্রেমের বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শিখণ্ডী, যিনি পূর্বজন্মে নারী (অম্বা) হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি জন্মান্তরে রাজা দ্রুপদ এর কন্যা শিখণ্ডিনী রূপে জন্ম নেন যিনি পরবর্তীতে পুরুষত্ব প্রাপ্ত হয়ে শিখণ্ডী নামে পরিচিত হন এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্মের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ান। এ ছাড়া, সমুদ্রমন্থনের সময় ভগবান বিষ্ণুর ‘মোহিনী’ রূপ ধারণ এবং শিব ও মোহিনীর মিলনে হরিহরপুত্র আয়াপ্পার জন্ম নেওয়ার পৌরাণিক কাহিনী ভারতীয় সংস্কৃতিতে সমলিঙ্গের আকর্ষণের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক স্বীকৃতিকেই তুলে ধরে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাৎস্যায়ন রচিত বিখ্যাত যৌন বিষয়ক গ্রন্থ কামসূত্রে সমকামিতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ক্রিয়া হিসাবে বর্ণনা রয়েছে এবং এর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থের একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় ('ঔপরিস্টক/औपरिष्टक ') সমলিঙ্গের মানুষের ওরাল সেক্স বা মুখ মৈথুনের বর্ণনা পাওয়া যায়। কামসূত্রে সমকামী ও রূপান্তরকামীদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে অভিহিত করা ছিল। শুধু তাই নয়, কোনো সামাজিক বা পারিবারিক অনুমতি ছাড়াই সমলিঙ্গের দুজন মানুষ একসঙ্গে বসবাস ও 'গান্ধর্ব বিবাহ' বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রাচীন ভারতে মনুস্মৃতি বা অর্থশাস্ত্র-এর মতো কিছু গ্রন্থে সমকামিতাকে বর্ণচ্যুত হওয়ার মতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জরিমানা বা প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হয়েছিল। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এই শাস্তিগুলো ছিল মূলত প্রতীকী এবং সাধারণ বিষমকামী ব্যভিচারের থেকে অনেক কম কঠোর। মধ্যযুগে খাজুরাহো, কোনার্ক এবং বেশ কিছু প্রাচীন মন্দিরের গায়ে খোদাই করা ভাস্কর্যগুলোতে নারীদের একে অপরকে আলিঙ্গন বা পুরুষদের সমকামী আচরণের চিত্র প্রমাণ করে যে তৎকালীন সমাজে এই বিষয়গুলো গোপনীয় হলেও বর্জিত ছিল না।
মুঘল আমলে রাজদরবারে ও অভিজাত শ্রেণীতে সমপ্রেম এবং কম বয়সি কিশোরদের প্রতি আকর্ষণ (Pederasty) বেশ প্রচলিত এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর তাঁর আত্মজীবনী বাবরনামা-তে 'বাবুরি' নামের এক কিশোরের প্রতি তাঁর গভীর প্রেম ও আকুলতার কথা কোনো দ্বিধা ছাড়াই অকপটে লিখে গেছেন। শচীন্দ্রলাল রায়ের 'বাবরনামা'-এর বাংলা অনুবাদ 'বাবরের আত্মকথা'-য় রয়েছে, "এই অবসর সময়ে শিবির বাজারের একটি ছেলের সঙ্গে হঠাৎ আমার দেখা হয়ে যায়। তার নাম বাবুরি। আমার নামের সঙ্গে তার নামের অদ্ভুত সাদৃশ্য ছিল। দেখা মাত্রই তার প্রতি আমার একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। যা আমাকে তাকে নিয়ে লিখতে অনুপ্রাণীত করে: -গভীর প্রেমে পড়ে গেলাম আমি, মুগ্ধ হলাম, পাগল হলাম, মনের কথা জানেন অন্তর্যামী। এর আগে আমি কারও প্রতি এমন উগ্র ভালবাসা বা আকর্ষণ অনুভব করিনি। বলতে কি ভালবাসা কিংবা উগ্র কামনার অভিজ্ঞতা আমার এর আগে কোন দিনই হয়নি এবং কারও কাছ থেকে শুনিওনি। এমন অবস্থায় পড়ে কিছু করতে না পেরে তাকে নিয়ে শুধু ফারসীতে কবিতা লিখে যাই, তার মধ্যে একটি এই- কোন প্রেমিক বল আমার মত মুগ্ধ, প্রেমানলে এমন ভাবে দগ্ধ । আমার মতো অসম্মানের পশরা কে বা বয়! কে দেখেছে এমন পাষাণ হিয়া, কেন এমন ঘৃণা? কেন নাই কো মায়া? করো দয়া, নইলে আমার প্রাণ যে রাখা দায়।"
শুধু বাবরই নন, দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি এবং তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুরের সম্পর্কও ইতিহাসে বহুল আলোচিত। একই সঙ্গে, সেই যুগের সুফি সাহিত্য ও ফারসি কবিতায়, ভালোবাসার রূপক হিসেবে সমকামী প্রেমের ব্যবহার ছিল। সুফি সাধক শাহ হুসাইন ও মাধো লালের আধ্যাত্মিক ভালোবাসাও এই ভালোবাসার পালে হাওয়া লাগায়। যদিও পরবর্তীকালে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে ফতোয়া-ই-আলমগিরি আইনের মাধ্যমে, সমকামিতার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির বিধান আনা হয়, তবুও মোগল চিত্রশিল্প ও কবিতায় সমপ্রেমের চর্চা অব্যাহত ছিল। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতবর্ষ সমকামিতাকে কোনো ‘অস্বাভাবিক রোগ’ বা ‘পাপ’ মনে করত না। বরং সমপ্রেমকে জীবনের একটি অংশ হিসাবেই দেখা হত। আজ যে রক্ষণশীলতাকে ভারতীয় ঐতিহ্য বলে দাবি করা হয়, তা আসলে ব্রিটিশ সময়কার চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার, যা ভারতের নিজস্ব বহুত্ববাদী ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।