বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মন্দির । হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে এটিকে বলা হয়ে থাকে। ধর্মীয় কাহিনী অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেবের প্রলয় নৃত্যকালে এই স্থানে দেবী সতীর করকমল বা হাতের তালু পতিত হয়েছিল। 'যশোরেশ্বরী' নামের আক্ষরিক অর্থ হলো 'যশোরের ঈশ্বরী বা দেবী' এবং এই পীঠের অধিষ্ঠিত ভৈরব হলেন চণ্ড। ফলে তান্ত্রিক সাধক, ভক্ত এবং ঐতিহাসিকদের কাছে এই মন্দিরের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য অপরিসীম।
এই মন্দির নির্মাণের সঠিক সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। জনশ্রুতি আছে যে ত্রয়োদশ শতাব্দীরও আগে 'আনাড়ি' নামক এক ব্রাহ্মণ এই স্থানে প্রথম দেবীপীঠের সন্ধান পান এবং একশো দরজা বিশিষ্ট একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন নরপতি ও বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ক্ষমতাধর মহারাজা প্রতাপাদিত্য এই অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করার পর মন্দিরটির সংস্কার ও বিকাশ ঘটান। কিংবদন্তি রয়েছে যে, প্রতাপাদিত্যের এক সেনাপতি জঙ্গলঘেরা ঝোপঝাড় থেকে অলৌকিক আলো বা জ্যোতি বের হতে দেখেন এবং কাছে গিয়ে মানুষের হাতের তালুর আকৃতি বিশিষ্ট একটি প্রস্তরখণ্ড খুঁজে পান। সেই পবিত্র পাথরকেই দেবী যশোরেশ্বরী হিসেবে পুজো করা শুরু হয় এবং মহারাজা প্রতাপাদিত্য এখানে রাজকীয়ভাবে নতুন মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। যদিও এই ঘটনার সপক্ষে সেভাবে কোনও নথি পাওয়া যায় না। কিন্তু কিংবদন্তিতে থেকে গেছে এই ঘটনা। এছাড়াও এই মন্দিরের সংস্কারে লক্ষণ সেনের নামও উঠে এসেছে। সে যুগে এই মন্দিরটিকে কেন্দ্র করেই সমগ্র যশোর রাজ্য চালিত হত বলে বিশ্বাস করতেন তৎকালীন শাসকরা। এর থেকে কিছুটা এই ঈশ্বরীপুরের সেই সময়কার গুরুত্ব বোঝা যায়।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মূল মন্দিরের সঙ্গে সংলগ্ন রয়েছে একটি বড় আয়তাকার নাটমন্দির, যেখান থেকে ভক্তরা দেবীর মূল বিগ্রহ দর্শন করতে পারেন। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই মন্দিরটি বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশভাগ পরবর্তীতে একসময়ের জাঁকজমকপূর্ণ এই চত্বরের অনেক প্রাচীন কাঠামো ও দালান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে এখন কেবল কিছুমাত্র স্তম্ভ ও স্মৃতি অবশিষ্ট রয়েছে। তবে স আজও বহু ভক্তের সমাগম ঘটে এখানে। বিশেষ করে প্রতি বছর কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে বিশাল উৎসব ও মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন।
সাম্প্রতিককালে ২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালী মন্দির পরিদর্শন করেন এবং দেবীকে একটি রুপার স্বর্ণ জল করা মুকুট নিবেদন করেন, যা মন্দিরটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়িয়ে তোলে। কালের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই যশোরেশ্বরী কেবল একটি মন্দির নয়, বরং এটি বাংলা ও উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন।