উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপানের সংস্কৃতির সাথে ভারতের যোগসূত্র শতাব্দী প্রাচীন। ভারতের সনাতন ধর্মের বহু দেব-দেবী বৌদ্ধধর্মের হাত ধরে একসময় পাড়ি জমিয়েছিলেন জাপানে। সেখানে গিয়ে তাঁদের নাম এবং রূপের পরিবর্তন ঘটলেও, মূল সত্ত্বাটি থেকে গেছে একই। সনাতন ধর্মের বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা দেবতা গণেশ, জাপানে তিনি পরিচিত ‘কাঙ্গিতেন’ (Kangiten) বা ‘শিতেন’ নামে, যিনি জাপানি বৌদ্ধধর্মের গুহ্যতান্ত্রিক শাখা ‘শিংন’ এবং ‘তেন্দাই’-এর রহস্যময় দেবতা, অনেকেই ওনাকে বিনায়ক তেন নামেও পূজা করে থাকে। কাঙ্গিতেনের নামের অর্থ, ‘পরম আনন্দের দেবতা’। তবে জাপানি সংস্কৃতি ও তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ছোঁয়ায় কাঙ্গিতেনের রূপ এবং পূজার্চনা ভারতের প্রথাগত গণেশ পূজা থেকে অনেকটাই আলাদা এবং বেশ রহস্যে ঘেরা।
কাঙ্গিতেনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় তাঁর দ্বৈত রূপ, যাকে জাপানিতে বলা হয় ‘শোসিন কাঙ্গিতেন’। হিন্দু দেবতা গণেশ সাধারণত একই পূজা পান, জাপানে কাঙ্গিতেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মূর্তিটি হলো পুরুষ ও নারীর একটি আলিঙ্গনরত যুগল মূর্তি। এখানে দুজনেরই হাতির মাথা এবং শরীরটি মানুষের, বৌদ্ধতন্ত্রে এই রূপটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মূলত মহাবিশ্বের দুটি বিপরীত শক্তি, পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনকে নির্দেশ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিন্দুধর্মের ‘শিব-শক্তি’ বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ‘যাব-যুম’ ধারণার সাথে এর গভীর মিল রয়েছে।
ভারতের গণেশ মূর্তি যেখানে মন্দিরে সবার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকে, জাপানে কাঙ্গিতেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। কাঙ্গিতেনকে জাপানে ‘হিবুৎসু’ বা লুক্কায়িত বুদ্ধ বলা হয়। তাঁর দ্বৈত রূপের তান্ত্রিক গভীরতা এবং শক্তিশালী প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষের সামনে এই মূর্তি প্রদর্শন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি অনেক মন্দিরের প্রধান পুরোহিতও বছরের নির্দিষ্ট দিনে অত্যন্ত গোপনে এই মূর্তির উপাসনা করে থাকেন। সাধারণ ভক্তরা কেবল মন্দিরের বন্ধ দরজার বাইরে থেকে বা কাঙ্গিতেনের প্রতীকী মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অর্চনা করেন।
কাঙ্গিতেনের উপাসনা পদ্ধতিও বেশ রহস্যময়। ভারতে গণেশের প্রিয় প্রসাদ মোদক বা লাড্ডু হলেও, জাপানে কাঙ্গিতেনের প্রধান ভোগ হলো ‘দাইকোন’ বা সাদা মুলো। জাপানি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মুলো মানুষের ভেতরের রাগ, লোভ ও মোহ দূর করে মনের শুদ্ধি ঘটায়। এছাড়া কাঙ্গিতেনের সন্তুষ্টির জন্য বিশেষ তান্ত্রিক আচার পালন করা হয়, যেখানে দেবতার মূর্তির ওপর হালকা গরম তিল তেল ঢেলে অভিষেক করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই তৈলাভিষেক ভক্তের জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি ও অমঙ্গল ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।জাপানের রাজধানী টোকিওর ‘মাতুচিয়ামা শোদেন’ এবং ওসাকার ‘হোজান-জি’, এই দুটি মন্দিরে কাঙ্গিতেন পূজিত হন। আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জাপানেও কাঙ্গিতেনের জনপ্রিয়তা আকাশসমান। ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি এবং সাধারণ মানুষ তাঁদের বৈষয়িক সাফল্য, লটারি প্রাপ্তি, দাম্পত্য সুখ এবং সন্তান লাভের কামনায় কাঙ্গিতেনের শরণাপন্ন হন। ভক্তদের বিশ্বাস, কাঙ্গিতেন অত্যন্ত দয়ালু এবং তিনি ভক্তের মনের যেকোনো পার্থিব ইচ্ছা খুব দ্রুত পূরণ করেন। ভারত থেকে চীন হয়ে অষ্টম-নবম শতাব্দীতে জাপানে পৌঁছানো এই দেবতা আজ জাপানি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাঙ্গিতেন কেবল একটি ধর্মীয় চরিত্র নন, বরং তা ভারত ও জাপানের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং সনাতন ও বৌদ্ধ দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয়ের প্রতীক।