শহরে রাত নামে, একে একে নেভে 'ডেউটি', নিয়ন আলো চড়া হয় আরও। তিলোত্তমা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, আর কল্লোলিনীর ফাঁকা রাস্তা অপেক্ষা করে নতুন ভোরের। কিন্তু কথায় আছে না, কলকাতা ঘুমায় না! আর শুধু কলকাতা কেন, পৃথিবীর কোনও বড় শহরই বোধহয় ঘুমায় না। রাতের শহর প্রস্তুতি নেয় পরের দিনের। জেগে থাকে কিছু মানুষ, হয়ত যারা না থাকলে নতুন ভোর ঠিকঠাক শুরুই হত না। পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী, সংবাদমাধ্যমের কর্মী, সাফাই কর্মী, ক্যাব চালক, বড় বাজারের কুলি বা খবরের কাগজ বিক্রেতা। এদের প্রত্যেকের অবদান আমাদের সমাজে-শহরে রয়ে গেছে নিঃশব্দে। তারা থেকে যান 'অদৃশ্য কর্মী' হয়ে, আমরা যখন শান্তির ঘুম ঘুমাই, ওদের রাত কাটে নির্ঘুম।
রাতে যখন কোলাহল, গাড়ি-ঘোড়া কমে আসে রাস্তায়, মাঠে নামেন সাফাই কর্মীরা। ২০২৫ সাল থেকে কলকাতা পুরসভা ঠিক করেছিল কলকাতাবাসী কে তারা উপহার দেবে 'পরিছন্ন ভোর', আর মাঝ রাত থাকতেই সাফাই কর্মীরা শুরু করে দেয় কাজ। পুরসভার এক সাফাই কর্মীর বয়ানে, "দিনের বেলা ঝাড়ু দিলে মানুষের হাঁটাচলায় সমস্যা হয়, গাড়ির জটলা থাকে। তাই আমরা রাতে কাজ করি। লোকে সকালে উঠে পরিষ্কার রাস্তা দেখে।" শীতের রাত হোক আর বর্ষার বৃষ্টি, ওদের কাজ চলে প্রতিরাতেই।
ছবি:এআই
মাঝরাতে আমরা যখন গভীর ঘুমে, মাঝে মাঝেই শোনা যায় বাঁশির আওয়াজ বা লাইটপোস্টে লাঠির বারি। আমারও নিশ্চিন্ত হয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি আবার। জানি পাহারা দেওয়ার জন্য মানুষ রয়েছে। সিনেমার 'জাগতে রাহো' থেকে বাস্তবের এই জেগে পাহারা দেওয়া প্রতি রাত যথেষ্ট কষ্টের। স্থানীয় এটিএমের এক নিরাপত্তারক্ষীর কথায়-"রাত জাগাটা মোটেও সহজ নয়। মাঝরাতে যখন শরীর আর চোখ ঘুমে ভেঙে আসতে চায়, তখন চোখে মুখে জল দিয়ে, চা খেয়ে নিজেকে জাগিয়ে রাখি। বুক ধড়ফড় করে কোনো বিপদের আশঙ্কায়। কিন্তু আমার একটু অসতর্কতায় বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, এই দায়িত্ববোধ থেকেই ঘুম তাড়িয়ে দিই।"
রাত শেষ হয়ে যখন আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, ঠিক তখনই কর্মব্যস্ততা বাড়ে খবরের কাগজ বিক্রেতাদের। ঘড়িতে তখন ভোর সাড়ে চারটে, প্রেস থেকে গরম কাগজের বান্ডিল যখন মোড়ে মোড়ে এসে পৌঁছায়, তখন শুরু হয় তাদের ব্যস্ততা। ঘুমচোখ মুছে তারা দ্রুত হাতে কাগজ ভাঁজ করেন, ভেতরে ঢুকিয়ে দেন বিজ্ঞাপনের লিফলেট। ভোর পাঁচটার মধ্যে প্যাডেলে চাপ দিয়ে কাগজ পেয়েছে দেন ঘরে ঘরে। পুরো শহর,দেশ ঘুমানোর পর কী কী ঘটল, সেই খবরগুলো ভোরের চায়ের কাপে পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ।
এছাড়াও থেকে যায় এরকম অসংখ্য মানুষ যাদের কথা বলতে গেলে লিখে শব্দ ফুরাবে না। সবজি, ফুলের বাজার বা দুধের ডিপো, এরা ঘুমিয়ে পড়লে শহর অচল হবেই। হ্যাঁ অনেকেই বলতে পারেন কাজ করছেন টাকার বিনিময়ে, কিন্তু সত্যি করে বলুন তো আমরা তাদের সেই পারিশ্রমিক দিতে পারি? তার মধ্যে সমাজের নিচু স্তরের প্রান্তিক মানুষ হয়েই রয়ে গেছেন তারা আজও। এই কর্মীরা কোনও পদক পান না, পান না উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা সম্মান, হয়ত দু-মুঠো ভাতের জন্যই এই পেশাকে বেঁচে নিয়েছেন তারা। ঘুমিয়ে যাওয়া এই শহরের বুকে জেগে থাকা মানুষ গুলো উপহার দিয়ে যায় নিরাপদ,সুন্দর আর নতুন ভোরের।