'অট্টহাসে ওষ্ঠ পাতো দেবী সা ফুল্লরা স্মৃতা।
বিশ্বেশো ভৈরব স্তত্র সর্বাভীষ্ট প্রদায়ক।।'
কথায় আছে 'কালিকা বঙ্গদেশে চ', বঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালী। আর শাক্ত ভূমি এই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শক্তিপীঠ। লাভপুরের দেবী ফুল্লরা সতীপীঠ ভারতের অন্যতম জাগ্রত এবং ঐতিহাসিক তীর্থক্ষেত্র। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার অন্তর্গত লাভপুর শহরে অবস্থিত এই মন্দিরটি গাছপালায় ঘেরা, ছায়াময় পরিবেশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাল মাটির দেশ বীরভূম এমনিতেই শক্তি সাধনার বদ্ধভূমি এবং এই শক্তিপীঠের ইতিহাস, পৌরাণিক গাথা ও তন্ত্র-চর্চা বাংলার শাক্ত সাধনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তন্ত্রচূড়ামনি ও পুরাণ অনুসারে, লাভপুরের এই ফুল্লরা মহাপীঠ হল একান্ন সতীপীঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পীঠ। দক্ষযজ্ঞের পর মহাদেবের তাণ্ডবনৃত্য থামাতে ভগবান বিষ্ণু যখন সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবী সতীর মৃতদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করেন, তখন এই স্থানে সতীর অধ ওষ্ঠ পতিত হয়েছিল। দেবী এখানে ‘ফুল্লরা’ নামে এবং তাঁর ভৈরব বিশ্বেশ।
দেবী ফুল্লরা এখানে সিঁদুর এবং কুমকুম চর্চিত কচ্ছপ-আকৃতির একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড। এই শিলার সামনের অংশটি দেখতে অনেকটা ঠোঁটের মতো। প্রাচীন লোকবিশ্বাস অনুসারে, দেবী শিলার আকার প্রতি বছর সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ফুল্লরা সতীপীঠের সঙ্গে ত্রেতাযুগের রামায়ণের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উপাখ্যান জড়িত রয়েছে। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র যখন শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন, তখন তাঁর পুজো অর্চনার জন্য ১০৮টি নীল পদ্মের প্রয়োজন হয়েছিল। শ্রীরামচন্দ্রের পরম ভক্ত পবনপুত্র হনুমান এই ফুল্লরা মন্দিরের পাশে অবস্থিত বিশাল দিঘি থেকেই সেই ১০৮টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। জানা যায় কৃষ্ণানন্দগিরি মহারাজ কেদারনাথ থেকে স্বপ্নাদেশ পেয়ে লাভপুরে এসে জঙ্গলের ভিতরে খুঁজে পেয়েছিলেন শিলাখণ্ড। তারপর সেখানেই তৈরি হয় মন্দির। স্বপ্নাদেশ অনুসারে দেবীকে এখানেও জয়দুর্গা মন্ত্রে পূজা করা হয়। বীরভূম জেলার এই জায়গা প্রাচীনকালে অট্টহাস নামে পরিচিত ছিল। অসুর নিধনে দেবীর আবির্ভাবের পর তিনি অট্টহাসিতে আকাশ বিদীর্ণ করেছিলেন।
পরবর্তীতে, আজ থেকে ১৩০ বছরেরও বেশি আগে অর্থাৎ ১৩০২ বঙ্গাব্দে লাভপুরের তৎকালীন বিদ্যোৎসাহী ও ধার্মিক জমিদার যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানের পাকা মূল মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন। এই চত্বরে আজও তান্ত্রিক সাধনার জন্য একটি পবিত্র পঞ্চমুণ্ডির আসন সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে এই শক্তিপীঠে এক বিশাল উৎসব এবং পক্ষকালব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের বহু সাধু, তান্ত্রিক এবং সাধারণ পুণ্যার্থী এই সময় মায়ের মন্দিরে এসে ভিড় জমান। মায়ের নিত্যভোগে অন্ন, ডাল, নানা রকমের ভাজা ও তরকারির পাশাপাশি মাছ ও মাংস নিবেদন করার বিশেষ তান্ত্রিক নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। ছায়া সুনিবিড়, শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা লাভপুরের ফুল্লরা বাংলার সমৃদ্ধ শাক্ত ঐতিহ্য, প্রাচীন ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে চলেছে।