Calcutta Television Network

দারিদ্র নিয়ে "রোমান্টিসিজম"? ধারাভি ঘিরে তৈরী হয়েছে ‘রিয়েলিটি টুরিজম’-এর সত্যিটা কি!

দারিদ্র নিয়ে "রোমান্টিসিজম"? ধারাভি ঘিরে তৈরী হয়েছে ‘রিয়েলিটি টুরিজম’-এর সত্যিটা কি!
16 September 2026 04:57:18 pm

ধারাভির অবস্থান মুম্বাই শহরের একেবারে কেন্দ্রে। মাত্র ৫২০ একরের কম জায়গায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের বাস। আর সব বস্তির মতো সরু গলি, অন্ধকার খুপরি ঘর, খোলা নোংরা ড্রেন, দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেট, টিনের চাল আর গাদাগাদি করে থাকা ঘরবাড়ি আর পাঁচটা বস্তির মতই ধারাভি বয়ে নিয়ে বেড়ায় দারিদ্রতা। কিন্তু এই দারিদ্রতার আড়ালেও ধারাভিতে চলে সমান্তরাল অথচ অঘোষিত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। যা সব কিছুর থেকে আলাদা করেছে এশিয়ার এই বৃহত্তম বস্তিকে। 

মধ্য মুম্বাইয়ের এই বস্তি টেক্কা দিতে পারে অনেক ছোটখাটো দেশের অর্থনীতিকেও। আর সেই অর্থনীতির উপরে নির্ভরশীল এখানকার বাসিন্দারা। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, চামড়ার জিনিসপত্র তৈরি, মৃৎশিল্প এবং কাপড়ের টেক্সটাইল কারখানার মতো প্রচুর ছোট ছোট শিল্প গড়ে উঠেছে এখানে। এছাড়াও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান, পাউরুটি, মিষ্টি, বিস্কুট, পাঁপড় ইত্যাদি কারখানাও রয়েছে। প্রতি বছর এই ক্ষুদ্র শিল্পগুলো থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা হয়। আড়াই লাখের বেশি মানুষের রুটিরুজি জড়িয়ে আছে এই শিল্প গুলির সাথে। 


২০০৮ সালের পরে ধারাভি অবশ্য হয়ে উঠেছে বিদেশি পর্যটকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র। অস্কারজয়ী ছবি ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ মুক্তির পর  ধারাভি ঘিরে তৈরী হয়েছে ‘রিয়েলিটি টুরিজম’ (Reality Tourism) বা ‘স্লাম টুরিজম’ (Slum Tourism)। ২০০৫ সালে "রিয়ালিটি টুরস অ্যান্ড ট্রাভেল" নামে একটি কোম্পানি খুলেছিলেন কৃষ্ণা পূজারী। কৃষ্ণা পূজারী জানান, "বস্তির অভিজ্ঞতা নিতে আসা বেশিরভাগ পর্যটক আসেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়া থেকে। যখন আমার কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা, এক ব্রিটিশ বন্ধু ক্রাইস্ট ওয়ে এরকম একটা টুর চালু করার কথা বললেন আমি খুব বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বস্তি দেখতে চাইবে কেন কেউ? তারপর আমি বুঝলাম আসলে সেখানে অনেক কিছু দেখার এবং শেখার আছে। "

পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে কীভাবে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। বস্তি বাসিন্দাদের হাসিমুখে করে যাওয়া কাজ অনেকের কাছেই ইন্সপিরেশন। ধারাভি টুরিজমের একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো এর সামাজিক প্রভাব। বেশিরভাগ নামী ট্যুর অপারেটর সংস্থা তাদের উপার্জনের কিছু অংশ এই বস্তির মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য ব্যয় করে। স্থানীয় যুবকেরা গাইড হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। তারা বিদেশি পর্যটকদের কাছে নিজেদের চেনা পরিবেশকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। এছাড়াও বস্তি উচ্ছেদের ভয়ও অনেকাংশেই কমে গেছে।  


তবে এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে কিছু বিতর্কও রয়েছে। অনেকেই একে ‘দারিদ্র্যের বাণিজ্যিকীকরণ’ বলে সমালোচনা করেন। তাদের মতে, মানুষের জীবনসংগ্রামকে পর্যটনের বিষয়বস্তু বানানো নৈতিকভাবে কতটা সঠিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনেকেই একে দারিদ্র নিয়ে "রোমান্টিসিজম" আখ্যা দিয়েছেন। এই কারণে বর্তমান ধারাভি টুরিজমে 'দায়িত্বশীল পর্যটন' (Responsible Tourism)-এর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকে, যাতে স্থানীয় মানুষদের নিজস্বতায় কোনও আঘাত না লাগে। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই জীবনের চলার অঙ্গ। হতে পারে আপাতদৃষ্টিতে এই ধারাভি বস্তি নোংরা, কিন্তু ওই নোংরায় খুঁজলে ঠিক সোনা পাওয়া যাবে। অন্ধকার গলির ভেতরে যে আলোর উৎস রয়েছে, ধারাভি টুরিজম আজ বিশ্বের কাছে সেই সত্যই তুলে ধরছে। 

×
  • CTVN