ভারতে নির্বাচন আজ অত্যন্তই স্বাভাবিক একটি বিষয়। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা থেকে ফল প্রকাশ, পুরো প্রক্রিয়াটিকেই আমরা প্রায় অভ্যাস মায় উৎসবের মতো করেও দেখি প্রায়শই। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশন কিংবা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা বারবার প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময় যখন প্রথমবার কোটি কোটি মানুষকে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল, তখন কাজটি ছিল খানিক অসম্ভবের মতোই। দেশের বিপুল জনসংখ্যা, অশিক্ষার হার, প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগের অভাব, ভোটার তালিকা তৈরি, সবটুকু মিলিয়ে সামনে ছিল বিরাট এক প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। সেই কঠিন দায়িত্বের জন্যই প্রয়োজন হয়েছিল এমন একজন দৃঢ় মানুষের, যিনি হবেন সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রশাসক।
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নির্বাচন ব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝেছিলেন শুরু থেকেই। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৫০ সালে দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সুকুমার সেন। পেশায় একাধারের তিনি ছিলেন গণিতজ্ঞ এবং দক্ষ প্রশাসক। সংখ্যা তত্ত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। গণিতই সম্ভবত তাঁকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছিল। ১৮৮৯ সালে জন্ম সুকুমার সেনের, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন লন্ডন। গণিত নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে ১৯২১ সালে তিনি আইসিএস-এ যোগদান করেন। ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি বিচারবিভাগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যসচিবের দায়িত্বও হাতে পান তিনি। প্রশাসনিক দক্ষতার কারণেই তাঁর নাম পৌঁছেছিল নেহরুর দরবারে।
১৯৫০ সালের ২১ মার্চ। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন সদ্য স্বাধীন দেশে। তখনও আজকের মতো বহু সদস্যের নির্বাচন কমিশন ছিল না। একজন কমিশনারই গোটা ব্যবস্থার দায়িত্ব নিজে হাতে সামলাতেন। আর সামনে ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ১৯৫১-৫২ সালে সেই ভোটপর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আজকের ৫৪৩ আসনের লোকসভার তুলনায় তখন আসন সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, ৪৮৯টি। প্রথম নির্বাচনের আয়োজন যে কত বড় কাজ ছিল, তা গোটা পদ্ধতিটি খানিক পর্যবেক্ষণ করলে অনুধাবন করা যায়। দেশের কোন প্রান্তে কত ভোটার, কোথায় ভোটকেন্দ্র হবে, কী ভাবে প্রতিটা মানুষকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, সবটুকু বিষয়েই ছিল নতুন হিসাব। এমনকি সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষের ভোটাধিকার নিয়েও ভাবতে হয়েছিল তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে। যৌনকর্মীদের ভোটাধিকার নিয়েও সেই সময়ে ভারতবর্ষের বুকে আলোচনা করেছিলেন সুকুমার সেন।
যদিও পরবর্তী সময়ে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা ক্রমাগত আরও জটিল হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক চাপ, নিরাপত্তা এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ, সব সামলাতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কালে কালে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, রাজ্য প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ও রক্ষা করতে হয় তাঁদের। তবে ভারতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে সুকুমার সেনের জায়গাটি খানিক আলাদা। ১৯৫৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় আট বছর তিনি ওই পদে আসীন ছিলেন। শুধু ভারত নয়, সুদানেও নির্বাচন পরিচালনার কাজে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সুষ্টভাবে পালনও করেন সবটুকু। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৫৪ সালে পান পদ্মভূষণ। প্রথম সাধারণ নির্বাচন সফল করার কৃতিত্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে শেষ করা যায় না। তার পিছনে ছিল অসংখ্য প্রশাসনিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তবে সেই বিশাল আয়োজনের প্রথম পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে সুকুমার সেন ছিলেন অন্যতম মুখ। আজকের নির্বাচনী ব্যবস্থার যে সুবিশাল কাঠামো, তার গোড়ার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই বাঙালি গণিতজ্ঞ প্রশাসকই।