আলিয়া ভাট অভিনীত রাজি সিনেমার একদম শেষ ভাগে লেখা ছিল 'To the bravehearts who are anonymous in the history of our nation, like sehmat, they remain unnamed and unknown....', সিনেমার সেহমতের মত দেশের জন্য নীরবে কাজ করে গিয়েছে এরকম বহু বীর, যাদের খবর আমরা রাখি না। মাঝে মাঝে সরকারও তাদের স্বীকার করে না। পোশাকি নাম আন্ডারকভার এজেন্ট, শত্রু দেশের মধ্যে থেকেই ভিতরের খবর নিজের দেশে পাঠানোই কাজ এদের। বহু বড় আক্রমণকেও প্রতিহত করা সম্ভব হয় এদের জন্য। কিন্তু এদের জীবনে থেকে যায় প্রতি পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি আর সেই মৃত্যু হয় যন্ত্রণার।
'এক থা টাইগার' রিলিজ হওয়ার পরে আরও বেশি চর্চায় আসে এই পেশার বিষয়টি। টাইগারের মত বহু আন্ডার কভার এজেন্ট নিজের প্রাণ হাতে করে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছে। আমাদের পড়শি দেশেও থাকা বহু আন্ডারকভার এজেন্টের নাম চর্চায় এসেছিল, তাদের অনেকেই দেশে ফিরেছেন আবার অনেকেই নির্বাসনে গেছেন বা হয়েছে খুব কষ্টের মৃত্যুদণ্ড। এক থা টাইগারের পরে অনেকেই দাবি করেন সিনেমাটি যার ছায়ায় বানানো হয়েছিল তিনিও ছিলেন পাকিস্তানে থাকা ভারতীয় আন্ডারকভার এজেন্ট।
চরবৃত্তি নিয়ে আজ পর্যন্ত যে কজনের নাম আলোচিত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত নাম রবীন্দ্র কৌশিক। পড়শি দেশে ঢুকে তাঁর মত কাজ ভারতের আর কোনো আন্ডারকভার এজেন্ট করতে পারেনি সম্ভবত। ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল রাজস্থানের গঙ্গানগরে জন্ম রবীন্দ্রর। গঙ্গানগরের এসডি বিহানি পিজি কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি। রবীন্দ্রর ছিল থিয়েটারের শখ, চুটিয়ে সেই সময় অভিনয় করতেন তিনি। লখনউতে জাতীয় স্তরের কোনও এক অনুষ্ঠানে অভিনয় করার সময় তাঁর অভিনয় চোখে পড়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর আধিকারিকদের।
এরপর জীবনের মোড় ঘুরে যায় রবীন্দ্রর। টানা দুবছর দিল্লিতে কড়া অনুশীলন করানো হয় তাঁকে। শেখানো হয় উর্দু, অভ্যেস করানো হয় ইসলামিক সংস্কৃতির সাথে। যাতে খুব সহজেই পাকিস্তানের জনজীবনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে কৌশিক। সব কিছুর শেষে ১৯৭৫ সালে ২৩ বছর বয়সে পাকিস্তানে পৌঁছান তরুণ রবীন্দ্র। তাঁর নতুন পরিচয় হয় নবি আহমেদ শাকির। তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাশ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশনড অফিসার হিসেবে। পরে তিনি মেজর পদের উন্নীত হয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত এক দর্জির মেয়েকে বিয়ে করেন তিনি, তাদের একটি সন্তানও ছিল।
ছবি: এআই
কিন্তু এত কিছুর মধ্যে কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি রবীন্দ্রর আসল পরিচয়। 'র'-এর খাতায় তাঁর নাম ছিল 'ব্ল্যাক টাইগার', সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর ১৯৭৯ টি ১৯৮৩ বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভারত সরকারকে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্র কৌশিক। কিন্তু আরেক আন্ডারকভার এজেন্ট ইনায়ৎ মসিহা-র নির্বুদ্ধিতায় ধরা পড়লেন রবীন্দ্র কৌশিক। প্রথমে ইনায়ৎ ধরা পড়েন, পরে সে-ই বলে দেন কৌশিকের নাম। গ্রেপ্তার হওয়ার পরে শিয়ালকোটের জেলে তাঁর উপরে চলে অকথ্য অত্যাচার। প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করে হাইকোর্ট। তারপর লাহোর, শিয়ালকোট সহ বহু জেলেই তাকে রাখা হয়েছিল, এবং চলেছিল ভয়ঙ্কর অত্যাচার।
পরিবারের দাবি, জেলে থাকাকালীন চিঠি আসত রবীন্দ্রর। প্রতিটি চিঠিতেই লেখা থাকতো সেই অত্যাচারের কথা যা তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। দেড় দশকের বেশি অত্যাচার সহ্য করার পরে মুলতানের জেলে মৃত্যু হয় রবীন্দ্র কৌশিকের। সাম্প্রতিক কিছু পডকাস্টে রবীন্দ্রর পরিবার দাবি করেন, তৎকালীন ভারত সরকার তাঁকে ফেরানোর জন্য বিশেষ কোনো প্রয়াসই করেনি। ভাইকে শেষ বারের জন্য না দেখার আক্ষেপ নিয়ে আজও দিন কাটাচ্ছে রবীন্দ্রর দিদি।