জাতপাতের বিভেদ আর সামাজিক বঞ্চনার ইতিহাস ভারতবর্ষে দীর্ঘ। যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা কখনও স্লোগান, কখনও আন্দোলন, কখনো নীরব জনসংগ্রাম। কিন্তু ছত্তিশগড়ের রামনামী সমাজ যে কঠিন সড়ক বেছে নিয়েছিল, তা গোটা পৃথিবীতে খানিক ব্যতিক্রমী তকমা পায়। শরীরজুড়ে তারা খোদাই করেছে ‘রাম’ নাম। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল, ঈশ্বরের কাছে মানুষের পরিচয় জাতপাতের বহু উর্দ্ধে। উনিশ শতকে ছত্তিশগড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হত। ধর্মীয় অধিকার থেকেও তাঁদের বিরত রাখা হয়েছিল। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে তাঁরা কিন্তু কখনোই মন্দিরের দরজায় সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নেননি। বরং নিজেদের শরীরকেই করে তুলেছিলেন প্রতিবাদের দেয়াল।
কপাল, মুখ, বুক থেকে শুরু করে শরীরের নানা স্থানে তাঁরা ‘রাম’ নাম লিখতে শুরু করেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, যে ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান, সর্বশক্তিমানকে কোনও বিশেষ জাতের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি লোককাহিনি। কথিত আছে, পরশুরাম ভরদ্বাজ নামে এক ব্যক্তির শরীরে কোনও এক সময় রামনামের চিহ্ন প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছিল। কুষ্ঠরোগ থেকে সুস্থ হওয়ার পর তাঁর শরীরে এই অলৌকিক পরিবর্তন দেখা যায় বলে স্থানীয় অঞ্চলে প্রচলিত বিশ্বাস। পরবর্তীকালে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে শরীরে রামনাম লেখার রীতি গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে জাতপাতের বিরুদ্ধে সরব সামাজিক অবস্থানের প্রতীক। শরীরে কতটা অংশে রামনাম লেখা হয়েছে, তার ভিত্তিতেও তৈরি হয়েছে ভিন্ন পরিচয়। মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত যাঁদের শরীরে এই নাম খোদাই করা থাকে, তাঁদের বলা হয় ‘নখশিখ’। শুধু মাথা বা কপালে লেখা থাকলে ‘শিরোমণি’, আর মুখমণ্ডলে রামনাম থাকলে তাঁদের পরিচয় ‘বদন’ নামে। রামনামীদের এই লেখার পদ্ধতিও খানিক আলাদা। কেরোসিনের পোড়া কালো অংশ থেকে উদ্ভুত কালি ও কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা বিশেষ ধরনের লেখনী দিয়েই শরীরে নাম আঁকা হয়। এই সমাজের ধর্মচর্চাতেও রয়েছে নিজস্বতা। কোনও দেবমূর্তিকে সামনে রেখে পুজো করার বদলে তাঁরা রামচরিতমানস পঠনে বিশ্বাসী। তবে গ্রন্থের সব অংশ তাঁরা মানেন না। জাতিভেদ বা বর্ণভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করে এমন অংশ বাদ দিয়ে তাঁরা কবিরের বাণীও নিজেদের পাঠ ও গানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কী অদ্ভুত সম্প্রীতির মিশ্রণ তাঁদের সংস্কারে!
ভজনের সময় প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ব্রোঞ্জের ঘুঙুর। প্রতি বছর পৌষ মাসে বসে তাঁদের তিন দিনব্যাপী বিশাল ভজনের আসর। প্রতি বছর ভিন্ন কোনও গ্রাম এই সুবিশাল আয়োজনের দায়িত্ব নেয়। ফলে উৎসবের খরচ এক জায়গার ওপর চাপিয়ে না দিয়ে পালা করে বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে বিভাজন করে দেওয়া হয়। আয়োজক গ্রামের স্কন্ধে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে। প্রয়োজনের সময়ে মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে সেখানে শস্য মজুত করে রাখা হয়। খরা দেখা দিলে শুধু নিজেদের সম্প্রদায়ের মানুষ নয়, অন্য ধর্মের মানুষদের মধ্যেও সেই খাদ্য বিলি করে দেওয়া হয়। বিয়ের ক্ষেত্রেও রামনামীদের মধ্যে সরলতার গুরুত্ব রয়েছে। কম খরচে, প্রায় কোনও আড়ম্বর ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন করার রীতি ছিল। পণ দান বা গ্রহণ থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকারও করানো হয় প্রতিটি নবদম্পতিকে। যদিও সময়ের সঙ্গে এই ধরনের বিয়ের প্রচলন কিছুটা কমেছে। রামনামী সমাজে কোনও ধর্মগুরু বা স্থায়ী প্রধানের কিন্তু আধিপত্য নেই। ১৯৬০ সালে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রশাসনিক প্রয়োজনেই তাঁদের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু হয়। তবু তাঁদের মূল আদর্শ একটাই, জাতের যাবতীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তারা প্রত্যেকে মানুষ এবং ঈশ্বরের কাছে সকলের সমান অধিকার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেই বিশ্বাস নিয়েই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছেন তাঁরা।