অপেক্ষার আর ৫ টা দিন, উৎসবে মেতে উঠবে বাঙালি। আজ মহালয়া, ঘুম জড়ানো চোখে "মহিষাসুরমর্দিনী" শেষ করেই তর্পণ, এর মাঝে দেবীর চক্ষুদান, ঢাকের আওয়াজ, পূজা আসছে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎসব হল দুর্গাপূজা। পূজা মানেই রাত জেগে প্যান্ডেল হপিং, আড্ডা হৈ-হুল্লোড় আর নতুন জামাকাপড়। আর এই উৎসব উদযাপনের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে খাওয়াদাওয়া, এক কথায় বাঙালির দুর্গাপূজা মানেই পেট-পূজা। প্যান-ডি আর জেলুসিল পকেটে রেখে ১৫ টা লুচি বা ১০-১২ পিস্ পাঁঠা সাঁটিয়ে না দিতে পারলে বাঙালির দুর্গাপূজা অন্তত পূজা বলে মনে হয়না।
এখন যদিও পূজা শুরুই হয়ে যায় মহালয়ার দিন থেকেই কিন্তু খাওয়াদাওয়ার ওপরে একটু জোর করেই কন্ট্রোল রাখতে হয় পঞ্চমী পর্যন্ত। ষষ্ঠীতে অনেক বাড়িতেই এখনো উপোস করা হয় অথবা নিরামিষ। লুচি, আলুর দম কিংবা ছানার ডালনা দিয়ে শুরু হয় উৎসবের ভুরিভোজ। তবে মহাসপ্তমী থেকেই শুরু হয়ে যায় আসল ধামাকা। সপ্তমীর দুপুরে অনেকের পাতেই থাকে ধোঁয়া ওঠা বাসমতি চালের ভাত, সাথে সোনা মুগের ডাল, ঝুরি ঝুরি আলু ভাজা এবং ইলিশ কিংবা চিংড়ির কোনো ঐতিহ্যবাহী পদ। আবার যারা প্যান্ডেল হপিংয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাদের জন্য সপ্তমীর রাত মানেই গরম গরম চিকেন রোল, মোগলাই পরোটা কিংবা ফিশ ফ্রাই। তবে এগুলো সবই একমুখী, এই পাঁচদিন মেনুর সত্যিই কোনো ঠিক থাকে না।
এবার মহাষ্টমী, সকালে খালি পেটে অঞ্জলি দিয়ে এসে পেট চুই-চুই। দিনের শুরু হয়ে যায় লুচি বা কচুরি দিয়েই। এবার থাকে একটা টুইস্ট, অষ্টমীতে বাঙালরা খায় ভরপেট আমিষ আর ঘটিদের নিরামিষ। বাঙালির চিরন্তন এই বাঙাল-ঘটি চাটাচাটি চলে পেটপূজা নিয়েও। এক দলের দুপুরের খাবার চাল, ডাল আর ঘিয়ের সুগন্ধে মাখামাখি গরম খিচুড়ি, সাথে পাঁচমিশেলি সবজির লাবড়া, বেগুনী, চাটনি এবং পায়েস। আবার এপার বাংলায় লুচি-পুরি খাওয়ারও চল রয়েছে। আরেক দলের পাতে তখন কচি পাঁঠার ঝোল, অনেক বাঙালদের বলতে শোনা যায়, অষ্টমী আবার নিরামিষ যায় নাকি?
মহানবমী মানেই উৎসবের অন্তিম লগ্নে এসে দাঁড়ানো। তবে আজ আর বাঙাল-ঘটির বিরোধ নেই, সবার পাতেই কচি পাঁঠা, মুরগি বা হরেক মাছ। মা-কেও দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। রেস্তোরাঁগুলোতে থিকথিক করে ভিড়। বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, মটন কষা থেকে শুরু করে চাইনিজ ফ্রাইড রাইস ও চিলি চিকেনের সুগন্ধে ম ম করে চারিদিক। ডায়েট? সেটা আবার কি? আরেকটা ডবল এগ চিকেন রোল হয়ে যাক।
দশমীতে মায়ের বিদায়ের বিষাদের মাঝেই শুরু হয় কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখের পর্ব। বিজয়ার প্রণাম আর শুভেচ্ছার সাথে প্লেটে হাজির হয় রসগোল্লা, সন্দেশ, কালাকাঁদ এবং ঘরের তৈরি নারকেল নাড়ু ও নিমকি। আসলে কি জানেন তো দুর্গাপূজা শুধু পূজাই নয়, এই উৎসব যেন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিলনমেলা। আর সেই সংস্কৃতির মূল উপাদান খাবার। রাস্তার ধারের চাট-ফুচকা থেকে শুরু করে বনেদি বাড়ির ভোগ কিংবা নামী রেস্তোরাঁর থালি, বাঙালির পূজার দিনগুলো প্যান-ডি আর জেলুসিলেই কাটে।