Calcutta Television Network

পৃথিবীর আদিমতম প্রবৃত্তি: প্রতিশোধ

পৃথিবীর আদিমতম প্রবৃত্তি: প্রতিশোধ
17 September 2026 • 01:04:47 pm

 যুদ্ধের কী আদৌ নিজস্ব কোনও নৈতিকতা আছে? নাকি যুদ্ধ শুরু হলেই ন্যায়-অন্যায়ের প্রচলিত মাপকাঠিগুলি ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে শুরু করে মানবমননে? ভারতীয় মহাকাব্য থেকে পাশ্চাত্য সাহিত্য, এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করলে বারবার সামনে আসে একটিমাত্র শব্দের উপস্থিতি। প্রতিশোধ, যা রয়ে গেছে চিরনশ্বর হয়ে।

মহাভারতের যুদ্ধনীতিতেও এমনই এক কঠোর হিংস্র বাস্তবতার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ক্লান্ত, আহত, পলায়নরত কিংবা আশ্রয় নেওয়া শত্রুকেও আক্রমণ করা অনুমোদিত। অশ্বত্থামার কাহিনি সেই নৃশংস যুদ্ধনীতিরই এক ভয়াবহ উদাহরণমাত্র। রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব শিবিরে তাঁর হামলা ইতিহাসের পাতায় আজও নৃশংসতার জ্বলন্ত প্রতীক। যুদ্ধের নিয়মকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করলে ন্যায় আর প্রতিহিংসার সীমারেখাগুলো দ্রুত মুছে যায়, লোলুপ রক্তের স্বাদ সেখানে বড় হয়ে ওঠে। শতাব্দী পেরিয়ে একই ভাবনা অন্য ভাষ্যে ফিরে আসে ইউরোপীয় সাহিত্যে। জন লিলির Euphues: The Anatomy of Wit-এ প্রেম ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘fair play’-এর নিয়ম কখনোই কার্যকর নয়। প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার সুদৃঢ় মননের প্রতিফলন যেখানে বাস্তব, ন্যায় কখনও সেই রাস্তায় সমান্তরাল হতে পারে না। অর্থাৎ, যে পরিস্থিতিতে মানুষ আবেগ ও সংঘাতের চরমতম সীমায় পৌঁছয়, সেখানে নৈতিকতার স্বাভাবিক কাঠামো বহুক্ষেত্রেই তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে।

শেক্সপিয়রের The Merchant of Venice-এর শাইলকও অন্যায়ের বদলে অন্যায় করার পক্ষ নেন। তাঁর যুক্তির ভিতরে রয়েছে অপমানিত মানুষের চরমতম ক্ষোভ। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তাই শুধু ব্যক্তিগত রাগ নয়; বহু সময় তা জন্ম নেয় দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অপমান ও ক্ষমতাহীনতার প্রতিচ্ছবি রূপে।

ইতিহাসে এমন উদাহরণের কিন্তু অভাব নেই। যে গোষ্ঠী দীর্ঘদিন শাসিত বা নিপীড়িত হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলের পরে তাদেরই একাংশ পুরনো ক্ষতের হিসাব মেটাতে চায়। জন্ম নেয় তীব্র ঘৃণা। কখনও সেই প্রতিক্রিয়া এসেছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, কখনও তা ভয়াবহ হিংসার নামান্তর। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী থেকেছে বারবার। ফলে প্রতিশোধকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক অদৃশ্য থেকে যায় কিছুক্ষেত্রে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে কঠিন ও মতান্তরে জটিল প্রশ্নটি সামনে আসে, অতীতের অন্যায় কি বর্তমানের আরও একটি অন্যায়কে আদৌ বৈধতা দিতে পারে? পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ডিসপ্লেসমেন্ট বা উৎখাত, নিপীড়ন, যুদ্ধ ও মৃত্যুর স্মৃতি মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় জমা হয় সময় অসময়। সেই স্মৃতি কখনও অধিকার আদায়ের শক্তি তৈরি করে, আবার কখনও প্রতিশোধের আগুনও প্রজ্জ্বলিত করে। পলি পড়ে না ঘৃণার আগুনে, সে ঠিক জ্বলে ধিকিধিকি। এক প্রজন্মের ক্ষত পরের প্রজন্মের হাতে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হয়ে উঠলে সংঘাতের শেষ কোথায়, সেটিই হয়ে ওঠে তখন সবচেয়ে জটিল ধাঁধা। নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই মনস্তত্ত্ব ভিন্নরূপে প্রত্যক্ষ করা যায়। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি, প্রচার ও রাজনৈতিক লড়াই থাকলেও ফল ঘোষণার পর বহু জায়গায় দেখা যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গিয়ে ঠেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন হিংসার কারণ হয়ে ওঠে, তেমনই দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা গোষ্ঠীগুলির অন্দরে পুরনো ক্ষোভও একসময় বিস্ফোরিত হতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা থাকলেও তা হিংসাকে কোনোদিনই ন্যায্যতা প্রদান করতে পারে না। কারণ ইতিহাস কোনও প্রতিশোধের আদালত নয়। সেখানে পুরনো অপরাধের নথি থাকে, ক্ষতের স্মৃতি থাকে, ক্ষমতার পালাবদল থাকে, কিন্তু প্রতিটি নতুন অন্যায়ের জন্য পুরনো অন্যায়কে অজুহাত বানালে প্রতিশোধের কালচক্র অনতিকাল পরেই এক অসীম বালিঘড়িতে পরিণত হবে। অতীত আমাদের শেখায়, নিপীড়িতের ক্ষোভ বাস্তব। কিন্তু ইতিহাস আরও একটি কঠিন শিক্ষার পাঠ দেয়! ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরে নিপীড়িত যদি নিপীড়কের পথই ক্রমাগত অতিক্রম করে, তবে শুধু পক্ষ বদলায়, অন্যায়ের চরিত্র থেকে যায় অসদৃশ। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জায়গায় তখন জন্ম নেয় আর এক নব্য অন্যায়ের ফিনিক্স পক্ষী।