গাঁজাখুড়ি বকার জন্য কী গাঁজা খাওয়া প্রয়োজন? বা মুখে মারিতং জগতে কী জগতের গালে সপাটে চপেটাঘাত পড়ে? তবে আর যাই বলুন বাঙালি কিন্তু চপ ও পকোড়ার পাশাপাশি আরেকটি শিল্পে সিদ্ধহস্ত। তা হল গুল মারা। গোলাগুলির মত ধেয়ে আসা গুল। সে যতই ইদানিং গুজ্জু ভাইরা ‘জুমলা’র আতিশয্যে টেক্কা দিক না কেন, গুল ও কাঠি বাঙালির ও এর কপিরাইট শুধুমাত্র বাংলার। এ জাতি তিলকে তাল করতে পারে দিব্যি, সাদাকালোয় মিশিয়ে দিতে পারে সাতটি রঙের মেলা। তবু আজ আলোচনা এ শিল্পের প্রাচীন এক পুরোধাকে নিয়ে। বঙ্গদেশের ‘গুল’জারিলাল ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের একমেবাদ্বিতীয়ম মুকুটহীন সম্রাট। অনেকে তুলনা টানতে পারেন বড়োদাই বা কম কিসে? দিব্যি তো ফাঁদতে পারেন ভুতুড়ে কিসসা। কিংবা সন্তুর প্ৰিয় বন্ধু জোজো। কাকাবাবুও হেসে ফেলেন যার গুলিস্তা শুনে। দিব্যি যাঁর জ্যোতিষ পিতৃদেব সাক্ষাৎ করেছে আফ্রিকান প্রেসিডেন্টের সহিত। ভারতে এসেইছেন শুধুমাত্র তাঁর সাথে দেখা করতে। কিংবা বুলিতে উড়িয়ে দেওয়া শত্রুর খুলি। তবু সবকিছুর উর্ধে ছিলেন একজন।
আল্পনা পুজোসংখ্যায় ছাপা হল একটি ছোটগল্প। ১৯৪৫ সাল। দুবার কেঁপে উঠেছে জাপানের জনপদ। অ্যাটমিক শক্তিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে ওপেনহাইমারের ও গোটা নীল গ্রহের। মুচকি হাসছেন হ্যারি ট্রুম্যান। নীরবে চলেছিল ম্যানহাটন প্রজেক্টের সলতে পাকানোর কাজ। এই সবকিছুর বিরুদ্ধে সৃষ্টি হল ঘনাদা নামক একটি চরিত্র। ক্ষুদ্র একটি মশা, যার মারণহুল নিভিয়ে দিতে পারে একটি গোটা সভ্যতার আলো। বায়ো-টেকনোলোজির মারনাস্ত্র। জাপানি বিজ্ঞানী মশার মুখের লালায় ঘটিয়েছেন এক অবিশ্বাস্য রাসায়নিক বদল। নিতান্তই খুদে কিন্তু মারণ ক্ষমতাশালী সেই প্রাণী উড়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। হয়ত তেলেনাপোতাতেও। লেখকের অজ্ঞাতে, তাঁরই সৃষ্ট চরিত্র হুল বসিয়েছে নিভৃতে। আজকের আধুনিক মাল্টিভার্সে তো এমনই হয়। যদিও মশার বংশ ধ্বংস করতে সেদিন উপস্থিত ছিলেন শ্রীমান ঘনশ্যাম দাস। তাঁর একটি চড়ই যথেষ্ট ছিল ব্যাটার ভবলীলা সাঙ্গ করতে। বেচারার না আছে কোনো পরিবারের হদিস, না আছে কোনো ভুত-ভবিষ্যত। তবু যেকোনো আড্ডার মধ্যমণি সে। আর পাঁচটা বঙ্গসন্তানের মতোই খাদ্যরসিক। জ্ঞানের জাহাজ মায় অভিজ্ঞতারও। দিব্যি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস আন্দাজ করতে পারেন মাগুরমাছের ছটফটানি দেখে আবার সামান্য এক পাথর তুলে ভাস্যমান একটি দ্বীপ অন্তর্হিত করে দিতে পারেন প্রশান্ত মহাসাগরে। তবু এই চরিত্রে আষ্টেপৃষ্টে যাপন করেছে বাঙালি। কারণ শত গুলেও মিশে ছিল না ধান্দাবাজির মোড়ক। বাঙালি যে মিথ্যে বুঝেও উপভোগ করেছে দেদার। আজ প্রতিদিন বেড়ে চলা প্রতিশ্রুতি নামক প্রাণঘাতী মিথ্যার বেসাতিতে যে নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্র রচিত হচ্ছে, তার বিপরীতে তাই একজন ঘনাদাকে দরকার ছিল।